ভোটের বাকি আর মাত্র ৩ দিন। এক দিন বাদে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রচার। এরই মধ্যে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবু যেন ভোট নিয়ে সংশয় কাটছে না। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ভোটের পরিবেশ নিয়ে ততই বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা।
কারণ ভোটের কয়েক দিন আগে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজধানী ঢাকা। এর প্রভাব পড়ছে ভোটের পরিবেশের ওপর। যদিও নির্বাচনের আগ মুহূর্তের এসব ঘটনার ওপর কঠোর নজরদারি রাখছে ইসি। তাই নির্বাচনের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নতুন করে কোনো দাবি না তুলে ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয় নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, ভোট নিয়ে আমরা এখনও কোনো চ্যালেঞ্জ ফেস করছি না। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। নির্বাচনের জন্য সহায়ক পরিবেশ বজায় রয়েছে। আমাদের ফোকাস হচ্ছে এ মুহূর্তে যারা মুভমেন্ট করছেন তারা যেন এগুলো না করেন। বিভিন্ন গোষ্ঠী কিংবা সংস্থার অনেক দাবি-দাওয়া থাকতেই পারে। কিন্তু এ মুহূর্তে সেই দাবি-দাওয়াও যেন না করে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এটা আমাদের আহ্বান। কারও দাবি-দাওয়া নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। যেহেতু নির্বাচনের বাকি আর ৩ দিন তাই এই সময়ে যেন কেউ না করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামান্যতম যেন নষ্ট না হয়।
তিনি বলেন, ভোটের দিনের পরিবেশও অনেক ভালো থাকবে বলে আমরা আশা করছি। এখন আর ভোট বানচালের কোনো সুযোগ আছে বলে আমরা মনে করছি না। দেশের অন্য সব নরমাল ফোর্স এখন কার্যকর। এ ছাড়া এক লাখ সেনাবাহিনী মাঠে কার্যকর আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব স্বাভাবিক এবং নির্বাচনের জন্য সহায়ক।
এদিকে গতকাল শনিবার ভোটের পরিবেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন। সেই সঙ্গে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে সূত্রাপুর থানার ওসিকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তিনি। গতকাল নির্বাচন ভবনে ইসি সচিব আখতার আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান ইশরাক হোসেন।
গত ২২ জানুয়ারি ভোটের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে সরগরম হয়ে উঠে নির্বাচনি মাঠ। এ ছাড়া প্রার্থীদের আচারণবিধি লঙ্ঘন, সরকারি কর্মকর্তাদের গণভোটের প্রচার ও প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নিয়ে পুরো সময়টাই উত্তপ্ত ও সর্তক ছিল নির্বাচন কমিশন। শেষ সময়ে এসে যখন ভোটের জোর প্রস্তুতি চলছে এবং সবার নজর যখন নির্বাচন কমিশনের দিকে ঠিক সেই সময়ে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবি ও পে-স্কেলের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে আন্দোলনকারীরা।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তার বোন মাসুমা হাদি বলেন, বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন থামবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যে বাংলাদেশ হবে ওসমান হাদির আদর্শের বাংলাদেশ। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঝালকাঠির নলছিটি পৌর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক বিক্ষোভ মিছিল শেষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।
এর অগে শুক্রবার বিকালে শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করলে বেশ কয়েকজন আহত হন।
এ ছাড়া শুক্রবার একই দিনে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন করেছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। এ সময় যমুনা ঘেরাও করতে গিয়ে ৩২ জনের বেশি কর্মচারী আহত হয়েছেন। এরপর তারা দাবি আদায়ে আন্দোলন আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেন।
ভোটের আগে এসব আন্দোলন ও দাবি-দাওয়াকে ভোট বানচালের পাঁয়তারা হিসেবে দেখছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একটি দলের নেতা বলেন, হাদি হত্যার বিচার খুবই স্পর্শকাতর, তাই পরিকল্পিতভাবে ভোটের চার দিন আগে এ ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে। এগুলো সব ভোট বানচালের পরিকল্পনা। ভোটের পরিবেশ বিতর্কিত করার চেষ্টা।
ইসি সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ৩২৭টি নির্বাচনি এলাকায় ৩৫৩টি আচারণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ২২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা জরিমানা করেন এবং ২১২টি মামলা করা হয়। অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১১৩ থেকে ১৫০টি সহিংস ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রথম দফার নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর (২২-৩০ জানুয়ারি) মাত্র এক সপ্তাহেই সংঘর্ষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২৫টিতে। বেশির ভাগ ঘটনায় দলীয় সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তেজনা ও বিরোধ থেকেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের ধরন ছিল দলীয় হামলা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার এবং ভাঙচুর। নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সামনের দিনে এসব ঘটনা আরও বাড়তে পারে। তাই ইসিকে আরও কঠোর হতে হবে। নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে হবে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম সময়ের অলোকে বলেন, এবার ভোটের পরিবেশ এখন পর্যন্ত অনেক ভালো। এটা ভোটের দিন পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। তবে এবার অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ অনেক বেশি। নির্বাচন কমিশনকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে।
সময়ের আলো/এআর