আসন্ন নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, ততই নির্বাচনি প্রচারণা আর গণসংযোগে সরগরম হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরার চারটি আসনের ভোটের মাঠ। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ চলছে গ্রাম-গঞ্জ, হাট-বাজার আর পাড়া-মহল্লায়। নির্বাচন সামনে রেখে জেলায় চলছে নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
তবে এবারের নির্বাচনে সাতক্ষীরার চারটি আসনের আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও নারী ভোটাররাই হবেন জয়-পরাজয়ের টার্নিং পয়েন্ট। তারাই হতে পারেন জয়-পরাজয়ের বড় নির্ধারক।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও ভোটের মাঠে তাদের প্রভাব রয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, আওয়ামী লীগের বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটাররা হেলে যেতে পারে জামায়াতের দিকে।
এছাড়াও চারটি আসনেই নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের কাছাকাছি। এতে নারী ভোটারের প্রত্যাশা, দাবি আর সিদ্ধান্ত এবং আওয়ামী লীগের ভোটাররা ঘুরিয়ে দিতে পারে নির্বাচনের ফলাফল। ফলে জেলার চারটি আসন নিয়েই চলছে নানা সমীকরণ।
ভোটারদের মতে, সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনের তিনটিতে জামায়াতের প্রার্থীদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি প্রার্থীদের। অন্য একটি (সাতক্ষীরা-৩) আসনে জামায়াতের সঙ্গে লড়াই হবে বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর। এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এমপি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে ধারণা করছেন স্থানীয় ভোটাররা।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতটি উপজেলা, ৭৭টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জেলায় সংসদীয় আসন চারটি। চারটি আসনে মোট ভোটার ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার নয় লাখ ১৪ হাজার ৯১৪ জন। আর পুরুষ ভোটার ৯ লাখ ১৭ হাজার ৮৬১ জন। চারটি আসনেই নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষের কাছাকাছি। ফলে ভোটের ফলাফলে তাদের সমর্থনকে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে নিয়েছে প্রার্থীরা।
সাতক্ষীরা-১ আসন
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট পাঁচ প্রার্থী। তারা হলেন, বিএনপি প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব, জামায়াতের অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ, জাতীয় পার্টির জিয়াউর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের শেখ মো. রেজাউল করিম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী. মো ইয়ারুল ইসলাম।
তবে মূল লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী হাবিব ও জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহর মধ্যে। এমনটাই জানিয়েছেন সাতক্ষীরা-১ আসনের ভোটাররা।
বিএনপির প্রার্থী হাবিব ও জামায়াতের প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ। ছবি : সংগৃহীত
জানা গেছে, বিএনপি প্রার্থী হাবিব দীর্ঘ সময় কারাবন্দী ছিলেন। বিগত ৫ আগস্টের পর তিনি মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরেছেন। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জোরেশোরেই নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন এ প্রার্থী।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন জামায়াত প্রার্থী ইজ্জত উল্লাহ। ফলে তিনি শুরু থেকেই প্রচারের বাড়তি সুযোগ পেয়েছেন।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮৪৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৩ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৭৩ জন। এ ছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন ২ জন।
সাতক্ষীরা-২ আসনে জনমত জরিপে এগিয়ে জামায়াত
সাতক্ষীরা-২ (সদর-দেবহাটা) আসনে জনমত জরিপে এগিয়ে আছেন জামায়াতের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক। তবে বিএনপির প্রার্থী আলিপুর ইউনিয়নের বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফের সমর্থক কম নয়।
জানা গেছে, এই আসনে অতীতে জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হলেও বিএনপির কোনো প্রার্থী এখনও বিজয়ী হতে পারেননি। তবে এবার প্রথমবারের মতো দেবহাটা উপজেলাকে সদর আসনের সঙ্গে যুক্ত করা ভোটের হিসাব কিছুটা জটিল হয়ে উঠেছে।
ফলে দেবহাটা উপজেলার ভোটারদের টানতে বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীই নিয়মিত গণসংযোগ ও প্রচারে সক্রিয় রয়েছেন।
জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল খালেক ও বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রউফ। ছবি : সংগৃহীত
অন্যদিকে, দেরিতে হলেও গণসংযোগ শুরু করেছেন জাতীয় পার্টি প্রার্থী সাবেক এমপি আশরাফুজ্জামান আশু।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-২ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬৮৫ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৬৫ জন। হিজড়া ভোটার ভোটার রয়েছেন ৪ জন।
সাতক্ষীরা-৩ : ‘গরিবের ডাক্তার’ না কি ধানের শীষ—কে হাসবে শেষ হাসি?
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আসনটিতে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ‘গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত ডা. শহিদুল আলম দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। এতে স্থানীয় বিএনপির ভেতরে বিভাজন দেখা দিয়েছে।
দলীয় বিভক্তি এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে চাপে রয়েছে আসনটির বিএনপি প্রার্থী সাবেক এমপি কাজী আলাউদ্দীন। তবে এ বিভক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিজয়ের স্বপ্ন দেখছেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার।
যদিও বিএনপির বিদ্রোহী ডা. শহিদুল আলম দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে তিনি দুই উপজেলাতেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন।
সূত্রে জানা গেছে, নিজ উপজেলা কালিগঞ্জে শহিদুল আলমের শক্ত অবস্থান থাকায় জয়লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার পক্ষে মাঠে রয়েছে দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত একাধিক নেতাকর্মী।
স্বতন্ত্র প্রার্থী শহিদুল আলম, বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন ও জামায়াতের প্রার্থী রবিউল বাশার। ছবি : সংগৃহীত
এদিকে, স্থানীয় প্রভাব, জনপ্রিয়তা ও দলীয় প্রতীক-সব মিলিয়ে জামায়াতের প্রার্থী মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীন এবং বিএনপির বিদ্রোহী বহিষ্কৃত নেতা ডা. শহিদুল আলমের মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ধারণা করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সব দিক থেকেই এগিয়ে আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ‘গরিবের ডাক্তার’ খ্যাত ডা. শহিদুল আলম। তবে আসনটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় হিন্দু ভোট ও তরুণ ভোটাররা জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হতে পারে বলেও জানান তারা।
সাতক্ষীরা-৪ : আসন পুনর্বিন্যাসে ভোটেও নতুন সমীকরণ
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) সুন্দরবন-ঘেঁষা এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে বেশ বৈচিত্র্যময়। এখানে সব বড় দল থেকেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জামায়াতের সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির তরুণ প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামানের মধ্যে মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির প্রার্থী মনিরুজ্জামান ও জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি : সংগৃহীত
জানা গেছে, শ্যামনগরকে আলাদা করে নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস করায় ভোটের সমীকরণও নতুনভাবে তৈরি হয়েছে। আসনটির তরুণ ভোটারদের কাছে ড. মনিরুজ্জামানের গ্রহণযোগ্যতা এবং গাজী নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতা-এই দুইয়ের সংঘাতে আসনটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা-৪ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৯৭ হাজার ৮৬৬ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৪ জন এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯১৮ জন। হিজড়া ভোটার রয়েছেন ৪ জন।