ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে নারাজ তেহরান। কিছুতেই তারা জিরো এনরিচমেন্ট বা শূন্য সমৃদ্ধকরণ মেনে নেবে না। এভাবেই নিজ দেশের কঠোর অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। রোববার তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা সফল করতে হলে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এক বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’ ইরান কোনোভাবেই মেনে নেবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আলোচনা সাপেক্ষ নয়। তাই দুই পক্ষের মধ্যে এমন আলোচনাই প্রয়োজন, যেখানে ইরানের ভেতরে সমৃদ্ধকরণও চালু থাকবে আবার এই কার্যক্রম শুধু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আস্থাও তৈরি হবে। খবর রয়টার্স, মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি ও এপির।
রয়টার্সকে এক আঞ্চলিক কূটনীতিক জানান, ইরান সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ও বিশুদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু শর্ত হলো ইরানের মাটিতে সমৃদ্ধকরণের অধিকার বজায় থাকতে হবে এবং এর বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর নিশ্চয়তা দিতে হবে। আরাগচির ভাষায়, ইরানের এই অবস্থান শুধু প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক নয়। বরং এটি স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। তিনি বলেন, কেউ ইরানি জাতিকে বলে দিতে পারে না তারা কী করবে আর কী করবে না।
একই সঙ্গে তেহরানে কূটনীতিকদের এক সম্মেলনে আরাগচি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ইরানের শক্তির মূল রহস্য হলো ‘বড় শক্তিগুলোকে না বলতে পারার ক্ষমতা’। তিনি বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব ভাবছে ইরান পারমাণবিক বোমা বানাতে চায়। কিন্তু বাস্তবে ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’ হলো তাদের চাপের কাছে নত না হওয়ার মানসিকতা। তিনি বলেন, তারা আমাদের বোমাকে ভয় পায়, অথচ আমরা বোমা-ই চাই না। আমাদের প্রকৃত শক্তি হলো বড় শক্তিগুলোকে না বলতে পারা।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি ‘পারমাণবিক বোমা’ শব্দটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করেছেন বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতে, ইরান ২০০৩ সালের আগে সংগঠিতভাবে সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা অস্ত্রমানের ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। তবু তেহরান দাবি করে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ফতোয়া অনুযায়ী তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
প্রথম দফায় গত শুক্রবার ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকরা পরোক্ষভাবে বৈঠক করেন। বৈঠকের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছাকাছি এলাকায় নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করে। তেহরানও আক্রমণ হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এর আগে গত বছর দুই দেশ পাঁচ দফা পারমাণবিক আলোচনা করলেও মূলত ইরানের ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে মতবিরোধের কারণে সেগুলো থমকে যায়। গত বছরের জুন মাসে ইসরাইলি হামলার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর তেহরান দাবি করে, তারা সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের আশঙ্কা, ইরানের এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে। তবে ইরান বরাবরের মতোই বলছে, তাদের কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। তাই ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিই বন্ধ করতে চায় ওয়াশিংটন-তেল আবিব। তা সে শান্তিপূর্ণ হলেও।
আলোচনার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বাড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনসহ যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান। আলোচনার দিনই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ওমানে উপস্থিত ছিলেন, যা অনেকের মতে ইরানের জন্য এক ধরনের সামরিক বার্তা। আরাগচি বলেন, আগেরবার আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছিল, তাই এবারও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে হচ্ছে। তার কথায়, একবার পেছনে হাঁটলে পরিস্থিতি এমন দিকে যাবে যা আর কারও নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
আব্বাস আরাগচি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনায় আনতে চায়। অথচ সেটি কখনোই আলোচনার এজেন্ডায় ছিল না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী ইরানের অধিকার সম্মান করা উচিত। পরবর্তী দফা আলোচনার তারিখ ও স্থান ওমানের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করা হবে, যা মাসকাটের বাইরে অন্য কোথাও হতে পারে।
সময়ের আলো/এসকে/