প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৩৫ এএম (ভিজিট : ২৩১)
সংগৃহীত ছবি‘মব’ সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে ভয় ও শঙ্কা রয়েই গেছে। একই সঙ্গে ভোটে নির্বাচন কমিশন ও মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এর আগে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল।
এ ছাড়া ২০১৪ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। কলঙ্কিত ওই নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই অভিজ্ঞতা সামনে রেখে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতার কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ভোটে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনকে কলঙ্কমুক্ত করতে চান কর্মকর্তারা। এ জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ডিসি ও ইউএনওরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনকে সুষ্ঠুু করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করা হয়েছে।
মাত্র দুদিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। দুটি ভোটে জেলা প্রশাসকরা রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতীতে দেখা গেছে, জেলা প্রশাসকরা অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অতি উৎসাহী হয়ে সরকারি দলের পক্ষ নিয়েছিলেন।
তাই এবারের নির্বাচনে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তা নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই নির্বাচন ডিসিদের জন্য চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়েই তাদের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এবার বেশিরভাগ ডিসি ও ইউএনও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন বলে আশাবাদী তারা।
আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ওঠে নানা অভিযোগ। ওই তিন নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনাও হয়। সাজানো প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বারবার নির্বাচিত করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তখনকার প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। দলটিকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছিল, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট দেওয়ার হার ১০০ শতাংশও দেখানো হয়। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সাবেক জেলা প্রশাসকদের মধ্যে যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর হয়েছে এমন ২২ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ২৫ বছর পূর্ণ না হওয়া বিতর্কিত ডিসিদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগের নির্বাচনগুলোতে দায়িত্ব পালন করা জেলা প্রশাসকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির সামনে থাকায় এবারের নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছেন বর্তমান ডিসিরা।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ এড়াতে সচেষ্ট রয়েছেন তারা। দায়িত্ব পালনে সামান্য বিচ্যুতিও ভবিষ্যতে তাদের প্রশাসনিক জবাবদিহিতার মুখে ফেলতে পারে বিষয়টি মাথায় রেখেই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে প্রধান উপদেষ্টা প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন।
জনপ্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (বিএএসএ) অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি কানিজ মওলা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসনের সব স্তরের কর্মকর্তাদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, একটি নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের নিয়মিত সমন্বয় সভা হচ্ছে। সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খুলনা জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব আইনের ভেতরে থেকে শতভাগ বজায় রাখা হচ্ছে। এবার সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত নির্বাচন যাতে হয় সেটির সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বদ্ধপরিকর জানিয়ে তিনি বলেন, সে অনুযায়ী তারা মাঠে কাজ করছেন।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন ডিসিদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে তাদের সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে তাদের প্রতি মানুষের আর কোনো আস্থা থাকবে না। তিনি বলেন, বিগত ভোটে কারচুপির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে আমলারা এবার একটা চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে এবার হয়তো তারা জোরালোভাবে দলীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না।
তবে এবার ঢালাও কারচুপি না হলেও কিছুটা পক্ষপাতিত্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, যেখানে যে দল প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পাবে তারা সেখানে কারচুপির চেষ্টা করবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়। এ ছাড়া নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়।
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে রোববার থেকে সারা দেশে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনি এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
একই সঙ্গে নির্বাচনি অপরাধ প্রতিরোধ ও আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে মাঠে থাকবেন ১ হাজার ৫১ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। রোববার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। ইসির কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং ‘সুরক্ষা’ অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে দেশের পরিস্থিতি সন্তোষজনক এবং নির্বাচনের জন্য সহায়ক।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বাহিনীভিত্তিক সদস্য সংখ্যাগুলো হচ্ছে আনসার ও ভিডিপি প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার সদস্য। পুলিশ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সদস্য। সশস্ত্র বাহিনী ১ লাখ সদস্য। বিজিবি ৩৫ হাজার সদস্য। বিজিবি, র্যাব, এপিবিএন এবং আনসার ব্যাটালিয়ন জেলা ও উপজেলাভিত্তিক মোবাইল এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে। উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কোস্ট গার্ড।
সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রভেদে নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনে ভিন্নতা আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬-১৭ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭-১৮ জন। মেট্রোপলিটন এলাকা সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন। দুর্গম এলাকা ২৫টি জেলার দুর্গম কেন্দ্রগুলোতে ১৬-১৮ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
সময়ের আলো/এআর