ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরে উৎপাদনশীলতায় ধস
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪০ এএম
সংগৃহীত ছবিএনসিটি ইজারা বাতিল ইস্যুতে চট্টগ্রাম বন্দরে দফায় দফায় চলছে ধর্মঘট। ধস নেমেছে চট্টগ্রাম বন্দরে উৎপাদনশীলতায়। কৃত্রিম সৃষ্ট এই সংকটে বাজারে ভেঙে পড়েছে পণ্য সরবরাহ চেইন। বিদেশি বায়ারদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পাঠানো যাচ্ছে না তৈরি পোশাক। দুদিন ধর্মঘট বন্ধ থাকার পর সচল না হতেই রোববার ফের অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম বন্দর। রোববার দিনভর জেটির বহির্নোঙরে কোনো জাহাজ আসা-যাওয়া করেনি।
জেটির পাশাপাশি বহির্নোঙরে কোনো জাহাজে পণ্য ওঠানামা হয়নি। খালাস বিঘ্নিত হওয়ায় রোববার বিকাল পর্যন্ত বহির্নোঙরে ভেসে থাকা বড় জাহাজের সংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে। এসব জাহাজের মধ্যে ৩৫টিতে আছে রমজানের ভোগ্যপণ্য। অন্য জাহাজগুলোতে আছে সার, সিমেন্ট ক্লিংকারসহ নানা পণ্য। সব মিলে জাহাজে আছে লাখ লাখ মেট্রিকটন আমদানি পণ্য।
অপরদিকে শনিবার পর্যন্ত ১৯ প্রাইভেট আইসিডিতে রফতানি পণ্যের কনটেইনার সংখ্যা ১৪ হাজার (প্রতিটি ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে) ছাড়িয়েছিল। গেল দুদিন কিছু কনটেইনার জাহাজে বোঝাইয়ের পর রোববার প্রাইভেট বন্দরের নৌবিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডে আমদানি ও রফতানি মিলে মোট কনটেইনারের সংখ্যা ৪৫ হাজারে ঠেকেছে।
আগের দুদিন ২৪ ঘণ্টায় ডেলিভারি কিছুটা বাড়লেও রোববার দিনভর বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের হার ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। শনিবার থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত ছয়জন আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতাকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। রোববার বিকাল ৪টায় বন্দর এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে লাল কার্ড সমাবেশ। সমাবেশে শ্রমিক নেতারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানান।
রোববার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০০ শ্রমিক কর্মচারীকে বন্দর ভবনে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তাদের বোর্ড রুমে মিটিংয়ে ডাকা হয়। কিন্তু শনিবার রাতেই তারা বৈঠক প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। ভয়াবহ এই সংকটময় মুহূর্তে আমদানি-রফতানিতে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা দিশাহারা। তাদের এই সংকটের কথা কার কাছে বলবেন বুঝতে পারছেন না।
বিজিএমইএর পরিচালক ও এলার্ট ফ্যাশনস লিমেটেডের এমডি মোহাম্মদ সাইফ উল্ল্যাহ মানসুর সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য আমদানি করা বিপুল পণ্য আটকা জাহাজে। গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল ছাড় করতে না পারলে বন্ধ হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাস বাস্তবায়ন না হওয়ার অজুহাত এনে রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা ধর্মঘটের ঘোষণা দেন। এই কর্মসূচিতে সমর্থন জানায় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)।
রোববার সকালে বন্দর গেটের আশপাশে শ্রমিক কর্মচারীরা অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের সেখানে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। যারা জেটিতে প্রবেশের জন্য গিয়েছিল তাদের দ্রুত প্রবেশ করিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। কাউকে জেটি গেটের আশপাশে অবস্থান করতে দেওয়া হয়নি। বন্দর এলাকাজুড়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ছিল। রোববার দুপুরের দিকে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু হ্যান্ডলিং কাজ হয়েছে। তবে দিনভর সব ধরনের কাজ কার্যত বন্ধ ছিল। বন্দর বহির্নোঙর থেকে কোনো জাহাজ জেটিতে প্রবেশ করেনি। আবার জেটি থেকে কোনো জাহাজ বহির্নোঙরে যায়নি।
পোশাক-সিমেন্ট কারখানায় কাঁচামাল সংকট : তৈরি পোশাক কারখানা সচল রাখার বড় উপকরণ কাঁচামাল। চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয় এসব কাঁচামাল। চট্টগ্রাম বন্দরে কাঁচামালবাহী বহু জাহাজ ভেসে আছে। এতে পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। আবার চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আছে অসংখ্য সিমেন্ট কারখানা। এসব কারখানায় সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য সিমেন্ট ক্লিংকার আমদানি হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এক ডজনের বেশি সিমেন্ট ক্লিংকারবাহী জাহাজ ভেসে আছে বহির্নোঙরে। জেটি বা বহির্নোঙর কোথাও খালাস করা যাচ্ছে না। এতে এসব কাঁচামাল সংকটে কারখানাগুলো বন্ধের ঝুঁকিতে পড়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, রফতানি পণ্য সময়মতো বায়াররা পাচ্ছেন না। আমদানি করা কাঁচামালবাহী জাহাজ ভেসে থাকায় দেশের বহু কারখানা বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে ব্যবসায়ীদের জন্য নেমে এসেছে নরক যন্ত্রণা।
যা বললেন চেয়ারম্যান : চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি নিয়ে নেগোসিয়েশন শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, কবে শেষ হবে আমরা বলতে পারি না। রোববার দুপুরে বন্দর ভবন চত্বরে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বন্দর সচল আছে দাবি করে তিনি বলেন, অপারেশনাল শ্রমিকদের কাজে কেউ বাধা দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেব। যদি আইন নিজের হাতে নিতাম তার জন্য যদি অন্য পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো তখন আপনারাই প্রশ্ন করতেন। কেউ যদি অবাধ্য হয়ে আইন নিজের হাতে নেয় তার মানে আমি কি আইন নিজের হাতে নেব? এ জন্য আমরা কখনোই বেআইনি কিছু করতে পারি না। রাষ্ট্রের আইনকে শ্রদ্ধা করি।
ছয়জনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ : চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান ধর্মঘট আন্দোলনে জড়িত নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে ৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শনি থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত বন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন। তবে ছয়জনকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করছে না পুলিশ।
সময়ের আলো/এআর