তেঁতুলিয়া ফুটেছে ভিনদেশি রাজকীয় ফুল ‘টিউলিপ’। ছবি : সময়ের আলো
ফুলের প্রতি মানুষের মুগ্ধতার শেষ নেই। কলি থেকে পূর্ণতা-ফুলের প্রতিটি রূপ যেন সৌন্দর্যের এক একটি আখ্যান। কবির ভাষায় প্রায় প্রতিটি ফুলের নামই তো নারীর নামে, যার রূপের মতোই কাছে টানে পুষ্পকলি। আর সেই সৌন্দর্যে যদি যোগ হয় ভিনদেশি রাজকীয় ফুল ‘টিউলিপ’, তবে তো সোনায় সোহাগা।
ঋতুরাজ বসন্তের আগমন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে এবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া রাঙিয়ে দিয়েছে এই রাজসিক টিউলিপ। এই ফুলের মায়ায় মজেছেন প্রেমিক যুগল থেকে শুরু করে নবদম্পতি ও ফুলপ্রেমীরা।
তেঁতুলিয়ায় এক টুকরো ‘নেদারল্যান্ডস’
শীতপ্রধান দেশ নেদারল্যান্ডসের ফুল টিউলিপ এখন ফুটেছে হিমালয়ের পাদদেশের সীমান্তঘেঁষা গ্রাম দর্জিপাড়ায়। উত্তরের এই জনপদ এখন এক সৌন্দর্যের দ্বীপে পরিণত হয়েছে। গোলাপ, গাঁদা কিংবা গ্লাডিওলাসের চিরচেনা আভিজাত্যকে ছাড়িয়ে এবার ফুলপ্রেমীদের হৃদয়ে ঝড় তুলেছে টিউলিপ।
দর্জিপাড়ার টিউলিপ উদ্যানে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থীরা প্রবেশমূল্য দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে ভিড় করছেন বাগানে। কেউ হাতে নিচ্ছেন হলুদ ‘স্ট্রং গোল্ড’, কেউবা লাল ‘লালিবেলা’ কিংবা গোলাপি ‘মিস্টিক ভ্যান ইজক’ জাতের টিউলিপ।
ভালোবাসার নতুন সাক্ষী টিউলিপ
বসন্তের সকালে শিশিরভেজা টিউলিপের হাসি যেন প্রেমের নতুন আভা ছড়াচ্ছে। ঠাকুরগাঁও থেকে এই বাগানে ছুটে এসেছেন নবদম্পতি জাকিয়া জান্নাত ও সায়মন জাকারিয়া।
জাকিয়া স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, খুবই সুন্দর টিউলিপ উদ্যান। তাছাড়া আজ ফাগুনের বসন্ত। একদিকে ভালবাসা দিবস আরেকদিকে বসন্ত মিলে টিউলিপে মুগ্ধতা কেড়েছে। তাই তো টিউলিপ উপহার দিয়ে আমাদের ভালোবাসাকে নতুন করে রাঙাতে চাই। পঞ্চগড়ের মাটিতে এমন ফুল ফুটবে, তা ভাবাই যায় না।
শুধু দম্পতিরাই নন, টিউলিপের আকর্ষণে ছুটে আসছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরাও। প্রথমবার বাস্তবে টিউলিপ দেখতে পেয়ে তারা রোমাঞ্চিত।
টিউলিপের আকর্ষণে ছুটে আসছেন অনেকে। ছবি : সময়ের আলো
শিমুলের লালে ফাগুনের আগুন আর টিউলিপের স্নিগ্ধতা যেন একাকার হয়ে মিশেছে তেঁতুলিয়ায়। দর্শনার্থীরা এই মুগ্ধকর মুহূর্তগুলোকে বন্দি করছেন সেলফিতে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়।
নারী ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত
গত পাঁচ বছর ধরে বেসরকারি সংস্থা ইএসডিওর সহযোগিতায় বাংলাদেশের খামার পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে উত্তরের পর্যটনের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার সীমান্তঘেঁষা দর্জিপাড়া গ্রামের প্রান্তিক নারী উদ্যোক্তারা টিউলিপ চাষ করছেন। এবার তাদের বাগানে ফুটেছে লালিবেলা, ডেনমার্ক, স্ট্রং গোল্ড এবং মিস্টিক ভ্যান ইজক জাতের মতো বাহারি রঙের হাজার হাজার টিউলিপ। এই প্রকল্প কেবল সৌন্দর্যই ছড়াচ্ছে না, বরং প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছে।
ফুল চাষি আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, বাগানে এখন হাজার হাজার ফুল হাসছে। আমরা ভালোবাসা দিবসের জন্য অনেক ফুল জমিয়ে রেখেছিলাম। ইতোমধ্যে কয়েক শতাধিক ফুল বিক্রি হয়েছে। আমরা স্বপ্ন দেখছি এই টিউলিপের লাভ দিয়ে আমাদের জীবন আরও সুন্দর হবে।
যেভাবে শুরু
তেঁতুলিয়ায় টিউলিপের স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন ইএসডিও’র পরিচালক ড. সেলিমা আখতার। প্রান্তিক নারীদের হাতে ভিনদেশি টিউলিপ ফুটিয়ে স্বপ্নের বাস্তবায়ন করেছেন।
তিনি বলেন, আমাদের প্রান্তিক নারীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই ফুল ফুটিয়ে নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তাদের হাতের ছোঁয়ায় তেঁতুলিয়া এখন একখণ্ড নেদারল্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এই টিউলিপ যেমন পর্যটকদের নজর কাড়ছে, তেমনি আমাদের নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
টিউলিপের রাজকীয় হাসিতে বসন্তের হাওয়ায় এখন তেঁতুলিয়া যেন এক রঙিন কাব্যগ্রন্থ। ভিনদেশি এই সৌন্দর্যের হাত ধরেই উত্তরের পর্যটনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। আর প্রান্তিক নারীদের হাতে ফুটেছে সচ্ছলতার পুষ্পকলি।