নির্বাচন এক দিনের বিষয় নয়। এটি একটি প্রক্রিয়া। নির্বাচনকে মডেল করতে হলে সেটি হতে হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। এই প্রক্রিয়ার সঠিক নিরূপণের জন্য কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কমিশন এ নির্বাচনকে নিজেদের নিরপেক্ষতার বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মতে, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এবং তিনি এটিকে মডেল নির্বাচনে পরিণত করতে চান।
অতীতের সব শঙ্কা, সংশয় ও বিভ্রান্তিকে পেছনে ফেলে দেশের মানুষ এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছে এক নতুন প্রাণোচ্ছলতায়। এই নির্বাচন শুধুই একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক জগতের এক নতুন সূচনার প্রতীক। দীর্ঘ দেড় যুগের অপার প্রত্যাশার অবসানে দেশের মানুষ এই দিনটি উপভোগ করেছে উৎসবের আমেজে। যেখানে প্রতিটি মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছে। অন্যদিকে ইসি তার কথা রেখে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু, সহিংসমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দেশের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন আসলে জয় করেছে সব পক্ষ। এটি স্বীকার করতে হবে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জয় হয়েছে গণতন্ত্রের, জয় হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। বিএনপি জোট তাদের ২১২ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, যা তাদের জন্য বড় সাফল্য। জামায়াত জোটও তাদের নির্বাচনি সাফল্য অর্জন করেছে, যা রাজনৈতিক দৃশ্যপটে একটি বড় পরিবর্তন। পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও এই নির্বাচনের মাধ্যমে বড় জয় পেয়েছে, কারণ তারা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও সুশৃঙ্খল নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হয়েছে।
এ ছাড়া এই নির্বাচন দেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘদিন গণতন্ত্রহীনতার অন্ধকারে থাকা দেশ এখন ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের পথে ফিরবে। এই নির্বাচন দেশের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে একটি স্থিতিশীলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই নির্বাচন অগ্রগতি ও স্থিতিশীলতার পথ সুগম করবে, কারণ অনিশ্চয়তার দোলাচলে স্থবির থাকা অর্থনীতি এখন আবার চাঙ্গা হওয়ার আভাস দেখছে।
এই নির্বাচন ছিল দেশের মানুষের জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ সময়ের পর ভোটের মাধ্যমে তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। উৎসবের মতো পরিবেশে ভোট দেওয়ার এই দিনটি দেশের সাধারণ মানুষকে এক নতুন স্বপ্নের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। নারীরা সবচেয়ে বেশি উপস্থিতি দেখিয়েছে ভোটকেন্দ্রে, যা দেশের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন। শান্তিপূর্ণ, অশান্তিমুক্ত এবং দায়িত্বশীল পরিবেশে এই নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় দেশের মানুষ গর্বিত এবং আনন্দিত।
অতীতের নির্বাচনগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, অন্ধকারে আচ্ছন্ন। রাতের অন্ধকারে ভোটের আয়োজন, বিনা ভোটে নির্বাচিত এমপির সংখ্যা, ভোটের দিন সংঘর্ষ ও হানাহানি- এসব ছিল এই দেশের নির্বাচনি ইতিহাসের কালো দাগ। কিন্তু এবারের নির্বাচন সেই অন্ধকার কাটিয়ে নতুন সূচনার প্রথম আলোকবর্তিকা। এই নির্বাচনে কোনো রক্তপাত হয়নি, কোনো অশান্তি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও সফল নির্বাচন সম্ভব হয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল আসলে জয় হয়েছে দেশ, জয় করেছে দেশের মানুষের। তবে নির্বাচনি দৌড়ে বিএনপির পরিকল্পনা এবং অভিজ্ঞতা সঠিক কাজে লাগিয়ে নিরঙ্কুশ জয় তুলে নিয়েছে। এটা ছিল তাদের ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম আর গণচাহিদার বড় প্রাপ্তি। দেশের সব পক্ষই আজ বিজয়ী- প্রতিটি ভোটার, প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রতিটি নাগরিক। এই নির্বাচন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, কারণ এটি আমাদের স্বপ্নের দেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। প্রত্যাশা- যেখানে গণতন্ত্রের চেতনায় সবাই একসঙ্গে এগিয়ে যাবে এক সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে। অভিনন্দন অন্তর্বর্তী সরকার, বিজয়ী দল, অংশগ্রহণকারী দল এবং নির্বাচন কমিশনকে।
সময়ের আলো/এনএ