রাজনৈতিক আন্দোলনের মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও জাতীয় নির্বাচনের ভোটের হিসাবে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে দেশের বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাঠের সক্রিয়তা এবং ভোটের বাক্সে প্রাপ্ত সমর্থনের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে। উত্তরের জেলা গাইবান্ধার নির্বাচনি ফলাফল সেই জাতীয় প্রবণতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর পর সংখ্যার বিচারে সমাজতান্ত্রিক ধারার সংগঠনগুলোর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ, মার্কসবাদী)। এসব দল নিয়ে গঠিত নির্বাচনি জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট এবারের নির্বাচনে অংশ নিলেও ভোটের ফলাফলে তাদের প্রভাব অত্যন্ত সীমিত ছিল।
নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনায় দেখা যায়, মোট প্রদত্ত ভোটের মধ্যে দেশের বাম দলগুলো সম্মিলিতভাবে ০.০৩ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছে; পৃথকভাবে অনেক দলের ভোটের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছিতে নেমে এসেছে। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাম দলগুলোর সম্মিলিত ভোটের হার ছিল ৩ শতাংশের বেশি, যা পরবর্তী তিন দশকে ধারাবাহিকভাবে সংকুচিত হয়েছে।
গাইবান্ধার ফলাফলে একই চিত্র : বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ছিল ২১ লাখ ৯০ হাজার ৪০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার পুরুষের তুলনায় প্রায় ২৫ হাজার বেশি। এ ছাড়া নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার। জেলার ৬৭৫টি ভোটকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ৪০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
এর মধ্যে জেলার চারটি আসনে বামপন্থি ছয়জন প্রার্থী অংশ নিলেও প্রত্যেকেই মোট বৈধ ভোটের এক শতাংশের নিচে ভোট পেয়েছেন। কোনো আসনেই তারা উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেননি। গাইবান্ধা-১ আসনে বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী পান ৩৯৯ ভোট; গাইবান্ধা-২ আসনে সিপিবি ও বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থীরা যথাক্রমে ২ হাজার ৩৪২ ও ৬২৯ ভোট; গাইবান্ধা-৩ আসনে সিপিবি প্রার্থী পান ৫১৫ ভোট এবং গাইবান্ধা-৫ আসনে দুই বাম প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ২৪৬টি ও ৪৬১টি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মোট ভোটের তুলনায় তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার এক শতাংশের অনেক নিচে অবস্থান করেছে।
কারণ নিয়ে ভিন্নমত : স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন সক্রিয় থাকলেও ভোটের ফলাফলে সেই উপস্থিতি প্রতিফলিত না হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাম রাজনীতির সাংগঠনিক বিভাজন, নির্বাচনি কৌশলের ভিন্নতা এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতা বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। বাম নেতারাও পরিস্থিতি স্বীকার করছেন।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে বাসদের গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী বলেন, বর্তমানে শক্তি দুর্বল হলেও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ও ধারাবাহিক গণসংযোগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে বাম দলগুলো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসতে পারে। সাংগঠনিক ঐক্য জোরদার করা এখন সময়ের প্রধান দাবি বলেও মন্তব্য করেন বাসদের গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী।
অন্যদিকে সাম্যবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা মনজুর আলম মিঠু মনে করেন, নির্বাচনি ব্যয়ের বৃদ্ধি, অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে কঠোর সমর্থনসংক্রান্ত বিধান এবং বিভিন্ন নির্বাচনি অনিয়ম বামপন্থি দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব সমস্যা ঘিরে ধারাবাহিক গণআন্দোলনের ঘাটতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সামনে কী পথ : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আন্দোলনের রাজনীতি থেকে নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রভাব বাড়াতে হলে বাম দলগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গড়ে তোলা, ঐক্যবদ্ধ নির্বাচনি কৌশল গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী জনভিত্তি তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় পরিসংখ্যান ও গাইবান্ধার নির্বাচনি ফলাফল একই বাস্তবতাই নির্দেশ করছে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়তা বজায় থাকলেও নির্বাচনি রাজনীতিতে বাম দলগুলোর প্রভাব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তবে সুসংহত কৌশল, ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি গণভিত্তি গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে আবারও বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এফআর