স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে বসেই নানা ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রবণতা বেড়েছে। ব্লাড সুগার, রক্তচাপ, অক্সিজেন স্যাচুরেশন থেকে শুরু করে প্রেগন্যান্সি বা কিছু সংক্রমণ পরীক্ষাও এখন ঘরেই করা যায়। প্রশ্ন হলো, এসব ঘরোয়া পরীক্ষা কতটা নির্ভরযোগ্য? এগুলোর ফলাফল কি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার মতো নির্ভরযোগ্য?
ঘরোয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা মূলত প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের জন্য উপযোগী। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ দরকার এমন রোগীদের ক্ষেত্রে এগুলো বেশ কার্যকর। যেমন ডায়াবেটিস রোগীরা গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা মেপে খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের সমন্বয় করতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন ব্যবহার করে প্রতিদিনের অবস্থা জানতে পারেন। এতে হঠাৎ জটিলতার ঝুঁকি কিছুটা কমে।
তবে নির্ভরযোগ্যতা অনেকটাই নির্ভর করে যন্ত্রের মান, ব্যবহার পদ্ধতি ও ব্যবহারকারীর সচেতনতার ওপর। সঠিকভাবে হাত না ধুয়ে গ্লুকোমিটার ব্যবহার করলে ফল ভুল আসতে পারে। মেয়াদোত্তীর্ণ স্ট্রিপ ব্যবহার করলে রিডিং সঠিক নাও হতে পারে। একইভাবে রক্তচাপ মাপার সময় সঠিক ভঙ্গিতে না বসলে বা কাফ ঠিকভাবে না পড়লে মাপের তারতম্য দেখা যায়। তাই শুধু যন্ত্র থাকলেই হবে না, ব্যবহারের নিয়ম জানা জরুরি।
অক্সিমিটার বা পালস অক্সিমিটার করোনা মহামারির সময় ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। এটি রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা জানাতে সাহায্য করে। তবে ঠান্ডা হাত, নখে নেইল পলিশ বা যন্ত্রের নিম্নমানের কারণে রিডিংয়ে ভুল হতে পারে। ফলে শুধু একটি যন্ত্রের ফল দেখে আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট ঘরোয়া পরীক্ষার আরেকটি বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম। এটি তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য হলেও খুব প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা করলে ফল নেগেটিভ আসতে পারে। তাই সন্দেহ থাকলে কয়েক দিন পর পুনরায় পরীক্ষা বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শাওন সিংহ বলেন, ঘরোয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা রোগীকে নিজের অবস্থার বিষয়ে সচেতন থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এটি খুবই কার্যকর। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো স্ক্রিনিং টুল মাত্র। কোনো অস্বাভাবিক ফল বারবার এলে বা শারীরিক উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ল্যাবভিত্তিক পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
অনেকে মনে করেন ঘরোয়া পরীক্ষা কখনোই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরীক্ষার বিকল্প নয়। এটি কেবল সতর্কবার্তা দিতে পারে। যেমন রক্তচাপ বা সুগারের মাত্রা বারবার অস্বাভাবিক এলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অনেক সময় যন্ত্রে স্বাভাবিক দেখালেও শরীরে উপসর্গ থাকতে পারে, আবার উল্টোও হতে পারে। তাই উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যন্ত্রের মান ও ক্যালিব্রেশন। স্বনামধন্য কোম্পানির অনুমোদিত যন্ত্র ব্যবহার করা নিরাপদ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর যন্ত্র সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে হাসপাতালের রিপোর্টের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
সবচেয়ে বড় কথা স্বাস্থ্য পরীক্ষা মানে শুধু সংখ্যা জানা নয়, এর সঠিক ব্যাখ্যাও জরুরি। একজন রোগী হয়তো একটি রিডিং দেখে ভয় পেয়ে যেতে পারেন, আবার কেউ অবহেলাও করতে পারেন। তাই সন্দেহজনক ফল এলে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে ঘরোয়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিঃসন্দেহে উপকারী ও সময় সাশ্রয়ী। তবে সচেতনতা, সঠিক ব্যবহার ও নিয়মিত চিকিৎসা পরামর্শের সমন্বয়েই এটি কার্যকর হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে যন্ত্র আমাদের সহায়তা করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত ভরসা হতে পারে না। সুস্থ থাকতে নিয়মিত চেকআপ ও চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/এআর