এক অথবা দুদিন পরেই রোজা শুরু হচ্ছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশে বেশ জাঁকজমকভাবেই পালন করা হয় পবিত্র রমজান। মাসটিতে খাদ্যাভ্যাসসহ বিভিন্ন চলাচলে পরিবর্তন আসে মুসলিমদের। এদিকে রোজাকে ঘিরে জমজমাট হয়ে ওঠে বাজারগুলো। চাহিদা বাড়ে বেশ কয়েকটি পণ্যের। তবে দেশের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী বাজারগুলোতে দেখা যায় দামের ঊর্ধ্বমুখিতা। যা হাঁসফাঁস করে তুলছে ক্রেতাদের। তবু জীবনের তাগিদে থেমে নেই কেনাকাটা।
রোজা শুরু হতে না হতেই যেন আলোচনার শীর্ষে লেবু। শরবতসহ বিভিন্ন খাবারে পরোক্ষভাবে জড়িত এই পণ্যটি। তবে বাজারে একচেটিয়া দাম ধরে রেখেছে লেবু। সারা বছর স্বাভাবিক থাকলেও প্রতিবারই রমজানের আগে বেড়ে যায় এর দাম। বর্তমানে এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত। যেখানে প্রতি পিস লেবুর দাম প্রায় ৩০ টাকা করে।
তবে দুই সপ্তাহ আগেও ৩০ টাকায় চারটি বা এক হালি লেবু পাওয়া যেত। এমনকি ২০ টাকাতেই মিলত এক হালি লেবু। লেবুর এই অস্বাভাবিক দামে রীতিমতো বিরক্ত ক্রেতারা। ফলে কেউ কেউ দাম শুনে না কিনেই চলে যাচ্ছেন দোকান থেকে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে লেবু নিতে এসে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বোরহান মিয়া বলেন, ‘শরবতের জন্য লেবু কিনতে বলেছিল বাসা থেকে। কিন্তু এমন দামে ব্যাগে ওঠার সুযোগ নেই লেবুর। রোজার আগে এমন বাড়তি দাম শুধু এ দেশেই সম্ভব। লেবু ছাড়াই আজকে বাসায় ফিরব।’ এদিকে বাজারে লেবুর এই বাড়তি দাম থাকলেও সরবরাহের কোনো কমতি নেই। বাজারে পর্যাপ্ত লেবুর মজুদ রয়েছে। বিক্রেতা সুহেল জানান, আমাদেরও বেশি দামে লেবু কিনতে হয়। তাই বিক্রিতে দাম বেড়ে গেছে। এ ছাড়া চাহিদা বেশি থাকায় দাম একটু বেশি।
এদিকে রমজান শুরুর আগ মুহূর্তে বাজারে বেশ চড়া সবজির দাম। কারওয়ান বাজারে প্রতি কেজি মুলা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। এ ছাড়া বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুরমুখী ৭০ টাকা, সিম ৫০ টাকা, ফুলকপি বড় সাইজ ৫০ টাকা, ব্রকলি ৬০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ৮০ টাকা, টমেটো ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এদিকে প্রতি কেজি শসা ১০০ টাকায় ও গাজর ৫০ টাকায়। এদিকে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৬০ টাকায়।
একই সঙ্গে বাড়তি রয়েছে মুরগির বাজার। প্রতি কেজি পোলট্রি বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়। তবে দরদাম করে ১৯০ টাকা পর্যন্ত কেনা যাচ্ছে। এ ছাড়া সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়। যা গত সপ্তাহেও কেজিপ্রতি ২০ টাকা কম ছিল। তবে ডিমের দামে স্থিতিশীলতা রয়েছে। ডজনপ্রতি ডিমের দাম এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এ ছাড়া মাছের বাজারেও ঊধ্বমুখিতা দেখা গেছে। যেন কমতি নেই কোনো মাছের দামে।
এদিকে রমজানের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। বাজারে খেজুরের দোকানে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। তবে খেজুরের দামে বেশ তারতম্য রয়েছে। সর্বনিম্ন ২২০ টাকাতেও খেজুর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে এই খেজুর। কারওয়ান বাজারে থাকা খেজুরের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে বাজারে সবচেয়ে কম দামে বাংলা খেজুর কেজিপ্রতি ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া খুচরায় এক কেজি জাহিদি খেজুর ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা, সুক্কারু (সাধারণ মানের) ২৫০ থেকে ৩০০, দাব্বাস ৪০০ টাকা, মাবরুর ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, মাঝারি মানের আম্বার মানভেদে ৭০০ থেকে ১৬০০, কামরাঙা ৬৫০ ও মরিয়ম ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায়, ভালো মানের মেডজুল ও আজওয়া খেজুর ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খেজুর কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বাজারে অনেক খেজুর রয়েছে। তবে দাম কিছুটা বেশি। পুরো রমজান মাসের জন্য একসঙ্গে খেজুর কিনে নিলাম। সাধ্যের মধ্যে ৫০০ টাকা করে কেজিপ্রতি খেজুর নিয়েছি।
জানা যায়, দেশে খেজুরের চাহিদার পুরোটাই আমদানি করে মেটাতে হয়। চাহিদার ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার কয়েকটি দেশ থেকে। এর মধ্যে ইরাক, ইরান, জর্ডান, মিসর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে খেজুর আসে দেশের বাজারে। এ ছাড়া সৌদি আরব ও পাকিস্তান থেকেও আসে খেজুর। বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী তৌফিক হাসান এ প্রতিবেদককে বলেন, রোজা চলে আশায় খেজুরের বেচাকেনা আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে। আমদানিনির্ভর হওয়ায় খেজুরের দাম কিছুটা বেশি পরে। এ ছাড়া হাতবদলে তো এর দাম কিছুটা বাড়বেই। তবে ক্রেতারা প্রয়োজনমতো দরদাম করেই কিনছেন।
এ ছাড়া রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদায় থাকা ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজিতে। তবে মানভেদে ৮০ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে। সাদা মটর কেজি ৭০ টাকা ও ডাল ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১০০-১১০ টাকায়।
বাজারের এই ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, রমজানের আগেও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।
কিন্তু রমজানের ঠিক আগমুহূর্তে দামটা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খারাপ সংস্কৃতি থেকে বের না হতে পারলে তা ঠিক করা কখনো সম্ভব হবে না। ব্যবসায়ীরা এই এক মাস ব্যবসা করে সারা বছরের লাভ তুলতে চায়। এমন সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত দল, বংশ ও মতের ঊর্ধ্বে গিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিচারে আওতায় আনতে হবে, মানে আইনের সম্পূর্ণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া শুধু রমজানে বাজার তদারকি না করে সারা বছরই করতে হবে। অথবা নূ্যূনতম এক থেকে তিন মাস আগে থেকে বাজারে কঠোর তদারকি করতে হবে। তা হলে এর রেশ রমজান মাসে পজিটিভ পড়বে।
এদিকে শুধু খুচরা ব্যবসায়ী নয়, আমদানিকারক, মিল-ফ্যাক্টরি, করপোরেট ও পাইকারি বাজারসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় মনিটরিং বাড়ালে যেকোনো পণ্যের দামে লাগাম টানা সম্ভব বলে জানান এই অ্যাকটিভিস্ট।