রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের নির্বাচনি ফলাফল ঘিরে বিতর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। বিএনপি প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন ভোট পুনঃগণনার আবেদন করার পর জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার জন্য পাঠিয়েছেন।
তবে এদিকে বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ইতোমধ্যে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ফলে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিএনপি প্রার্থী লিখিতভাবে অভিযোগ দাখিল করেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২–এর ৩৭ ধারার আওতায় তিনি ভোট পুনঃগণনার আবেদন জানান। অভিযোগে বলা হয়, নির্বাচনের দিন ও গণনার সময় বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং বিধি লঙ্ঘন হয়েছে।
তার দাবি, অধিকাংশ কেন্দ্রে জামায়াত সমর্থক প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পিতভাবে ৭ হাজার ৯৮৬টি বৈধ ভোট বাতিল করা হয়েছে, যেগুলো ধানের শীষ প্রতীকে পড়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। কিছু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স কেন্দ্রে গণনা না করে উপজেলা নির্বাচন অফিসে নিয়ে গিয়ে গণনা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া পোস্টাল ব্যালট গণনায় অনিয়ম, ফলাফল শিটে এজেন্টদের স্বাক্ষর না নেওয়া এবং প্রশাসনের উপস্থিতিতে ব্যালট স্থানান্তরের অভিযোগ তোলা হয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিতের আবেদনও করেছেন তিনি।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবকে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এই আসনে মোট ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৬৬ হাজার ১২০ জন। ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৪টি। গোদাগাড়ীতে ভোটের হার ৭৩.৬৩ শতাংশ এবং তানোরে ৭৭.৩৬ শতাংশ। দুই উপজেলায় মোট কেন্দ্র ছিল ১৫৯টি।
দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মুজিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ ভোট। ধানের শীষ প্রতীকে শরীফ উদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ১০ ভোট। ব্যবধান ছিল ৭৭৪ ভোট। পরে পোস্টাল ভোট যুক্ত হলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৪ ভোটে। পোস্টাল ভোটে জামায়াত প্রার্থী পান ২ হাজার ২ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী পান ৮৯২ ভোট।
অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে এপি পার্টির প্রার্থী মো. আব্দুর রহমান (ঈগল) পেয়েছেন ১ হাজার ৮০ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আল সাআদ (মোবাইল ফোন) পেয়েছেন ৬৫০ ভোট এবং গণঅধিকার পরিষদের মীর মোহাম্মদ শাহজাহান (ট্রাক) পেয়েছেন ৩৯৬ ভোট। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৯৬০টি এবং ‘না’ ভোট পড়ে ৭৪ হাজার ৯৪৯টি।
ভোট নিয়ে আপত্তি চলমান থাকলেও ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ নেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে কিছু অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তারা শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির নেতৃত্বে শপথ নিলেন রাজশাহী-১ আসনের নির্বাচিত সদস্য মুজিবুর রহমান শপথ বাক্য পাঠ করান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।
শপথের পর মুজিবুর রহমান বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংসদে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন এবং শাসনতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করবেন। একই দিন বিএনপির সদস্যরাও পৃথকভাবে শপথ গ্রহণ করেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনঃগণনার আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ফলাফল পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিতে পারে। আবার আবেদন খারিজ হলে ফলাফল বহাল থাকবে। শপথ গ্রহণ হয়ে যাওয়ার পরও কমিশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে পারে কি না, সে প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে।
ভোটের ব্যবধান কম হওয়ায় এই আসনের ফলাফল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন সব পক্ষের নজর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে। সেই সিদ্ধান্তই ঠিক করবে, বিতর্ক এখানেই শেষ হবে, নাকি বিষয়টি আরও বড় আইনি লড়াইয়ে গড়াবে।
সময়ের আলো/জোই