ইউক্রেন যুদ্ধ ও চলমান আলোচনা নিয়ে ইউরোপের শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ব্যাপক হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এটি কেবল আলোচনার অভিনয় মাত্র। কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো শান্তি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনা একটি চুক্তির দিকে ‘যথেষ্ট এগিয়ে গেছে’।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইউরোপের পাঁচটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন, রাশিয়া দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী নয়। তাদের মধ্যে চারজনের মতে, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে ব্যবহার করছে মূলত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা আদায়ের কৌশল হিসেবে। একজন গোয়েন্দা প্রধান সরাসরি বলেন, এই আলোচনা আসলে ‘আলোচনার অভিনয়’ মাত্র— বাস্তব কোনো সমাধানের উদ্দেশ্য নয়।
রয়টার্স লিখেছে, এই মন্তব্যগুলো ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে হোয়াইট হাউসের দৃষ্টিভঙ্গির বড় পার্থক্য সামনে এনেছে।
ইউক্রেনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে জুনের মধ্যেই একটি শান্তি চুক্তি করতে চায়। ট্রাম্প নিজে বিশ্বাস করেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। কিন্তু ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ ভিন্ন।
তাদের একজন বলেন, ‘রাশিয়া কোনো শান্তি চুক্তি চাচ্ছে না। তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে চায় এবং সেই লক্ষ্যগুলো বদলায়নি।’ এই লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানো এবং ইউক্রেনকে পশ্চিমা প্রভাবমুক্ত একটি ‘নিরপেক্ষ বাফার রাষ্ট্রে’ পরিণত করা।
আরেকজন গোয়েন্দা প্রধান বলেন, রাশিয়ার জন্য দ্রুত শান্তি বাস্তবায়ন করা জরুরি নয়। কারণ তাদের অর্থনীতি এখনও ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছায়নি। ফলে সময় নিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার সুযোগ নিচ্ছে তারা। এই কর্মকর্তারা তাদের তথ্যের উৎস প্রকাশ না করলেও জানা যায়, তারা মানবসূত্র, যোগাযোগ নজরদারি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা পদ্ধতির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তারা সবাই নিশ্চিত করেছেন যে, রাশিয়া এখন তাদের গোয়েন্দা নজরদারির প্রধান লক্ষ্য।
আলোচনায় অগ্রগতি নেই : এই সপ্তাহে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিশেষ করে ভূখণ্ড ইস্যুতে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত রয়ে গেছে। রাশিয়া চায়, ইউক্রেন তাদের বাহিনী দোনেৎস্ক অঞ্চলের সেই ২০ শতাংশ এলাকা থেকেও সরিয়ে নিক, যা এখন আর মস্কোর নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু ইউক্রেন এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চল পেলে আংশিকভাবে সন্তুষ্ট হতে পারে, কিন্তু তাতেও তাদের মূল লক্ষ্য ‘জেলেনস্কির সরকারের পতন’ পূরণ হবে না।
আরেকজন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, অনেকেই ভুল ধারণায় আছেন যে, ইউক্রেন যদি দোনেৎস্ক ছেড়ে দেয় তা হলে দ্রুত শান্তি চুক্তি হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। তার মতে, রাশিয়া তখন নতুন নতুন শর্ত সামনে আনবে; অর্থাৎ সেটিই হবে প্রকৃত আলোচনার শুরু।
আলোচনার দক্ষতাও প্রশ্নের মুখে : তৃতীয় একজন গোয়েন্দা প্রধান পশ্চিমা দেশগুলোর আলোচনার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করার ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের দক্ষতা ‘খুবই সীমিত’। এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বারবার বলছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোরও আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। তারা আগে বিভিন্ন সংঘাতে কাজ করলেও রাশিয়া বা ইউক্রেন বিষয়ে তাদের বিশেষজ্ঞ অভিজ্ঞতা নেই।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এ সমালোচনার জবাবে বলেছেন, ‘নাম প্রকাশ না করে সমালোচনা করা কোনো কাজে আসে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দলই সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করছে দুই পক্ষকে কাছাকাছি এনে যুদ্ধ বন্ধ করতে।’
দ্বিমুখী কৌশল : দুজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাশিয়া আলোচনাকে দুটি আলাদা পথে এগিয়ে নিতে চাইছে। একটি পথ যুদ্ধবিষয়ক। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক চুক্তি, যার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাও অন্তর্ভুক্ত।
জেলেনস্কির দাবি, তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানিয়েছে মার্কিন ও রুশ প্রতিনিধিরা প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে। এই প্রস্তাব দিয়েছেন রাশিয়ার প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিয়েভ। একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা বলেন, এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো ট্রাম্পের আগ্রহ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে সেসব রুশ ধনকুবেরদের (অলিগার্ক) সন্তুষ্ট রাখা যারা নিষেধাজ্ঞার কারণে যুদ্ধ থেকে তেমন লাভবান হয়নি। কিন্তু পুতিনের জন্য তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
চাপে থাকলেও ভেঙে পড়েনি রাশিয়ার অর্থনীতি : একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া একটি ‘সহনশীল সমাজ’। তারা কষ্ট সহ্য করে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারে।
তবে অন্য একজন সতর্ক করেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে রাশিয়ার অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার, উচ্চ সুদের হার— এসব কারণে চাপ বাড়ছে।
বর্তমানে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার ১৫.৫ শতাংশ, যা ঋণ গ্রহণকে ব্যয়বহুল করে তুলেছে। ২০২২ সালের আক্রমণের পর থেকে সরকারের ‘রিজার্ভ তহবিল’-এর তরল অংশ অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন স্থবিরতা ও মন্দার মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছে। গত বছর প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ শতাংশ। সব মিলিয়ে ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন স্পষ্ট। তা হলো রাশিয়া এখনই যুদ্ধ শেষ করতে চায় না। আলোচনাকে তারা কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে এবং দ্রুত কোনো শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা খুবই কম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আশাবাদী।
এই দুই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানেই আটকে আছে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা। যা আপাতত বাস্তবতার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রত্যাশার মতোই মনে হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এফআর