অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনে এক পরম গৌরবের কাল। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সুনিশ্চিত হয়ে যায় তখন থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সে নিয়ে পণ্ডিতমহলে ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেন হিন্দি যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে তেমনি উর্দুকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
এর দাঁতভাঙা জবাব দেন বাঙালি ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতিবিরোধী এবং স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিরও পরিপন্থী।
১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কমরেড পত্রিকায় ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবলেম নামে এক প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তার এই প্রবন্ধটি ছাত্র-জনতার মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। সে সময়ই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন ‘বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।’
১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এর পরপরই রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ায়। ১৯৪৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক ও ছাত্রের উদ্যোগে তমুদ্দুন মজলিস নামে একটি সাহিত্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। এর আহ্বায়ক ছিলেন নূরুল হক ভুঁইয়া এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম।
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, অধ্যাপক আবুল কাশেমসহ শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলার সপক্ষে যুক্তি দিতে থাকেন। তমুদ্দুন মজলিসের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির অনেক কর্মী জড়িত ছিলেন। বামপন্থি এই ছাত্রনেতারা তাদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করতে থাকেন। ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের মধ্যে ছিলেন শহীদুল্লা কায়সার, নাদেরা বেগম, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, আবদুল মতিন, মমতাজ বেগম, গাজীউল হক প্রমুখ।
গঠিত হয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ হরতাল ডাকে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তারিখে। ১১ মার্চে ঢাকায় সচিবালয়ের সামনে গণবিক্ষোভ ও মিছিল হয়। সে সময় অনেকে গ্রেফতার হন।
১৯৫২ সালে বছরের শুরুতেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার ন্যায্য দাবি আবার সামনে চলে আসে। আবার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত তুঙ্গে ওঠে। প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ববাংলার ছাত্র-জনতা। আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মতিন, গাজীউল হক, আহমদ রফিক, মাহবুব আলমসহ অনেকে।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে (বর্তমান মেডিকেল কলেজের একাংশ) আমতলায় ছাত্রদের সভায় সিদ্ধান্ত হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। চারজনের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে আসতে থাকেন। শুরু হয় লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপসহ পুলিশি হামলা। মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্র-জনতার নিরস্ত্র মিছিলে অতর্কিতে গুলি চালায় পুলিশ। শহিদ হন রফিকুল ইসলাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ আরও অনেকে। পুলিশ অনেক শহিদের মৃতদেহ গুম করে ফেলে। ভাষা আন্দোলনে ২২ ফেব্রুয়ারি শহিদ হন শফিউর রহমান ও আরও কয়েকজন পুলিশ মরদেহ সরিয়ে ফেলায় যাদের নাম জানা যায়নি।
এই হত্যার প্রতিবাদে সারা পূর্ববাংলা বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। ছাত্র-জনতার প্রবল দাবি ও প্রতিবাদের কারণে বাংলাভাষা পূর্ববাংলায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। শহিদ দিবস হিসেবে পূর্ববাংলায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হতে থাকে একুশে ফেব্রুয়ারি।
চর্যাপদের সময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলাভাষা চিরদিনই এই ভূখণ্ডের মানুষের প্রাণের ভাষা হয়ে টিকে আছে যুগে যুগে ভিন্নভাষী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে।
মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করেছে নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ভাষা ও সাহিত্যের ওপর কোনো আঘাত সহ্য করা হবে না। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়। একুশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনের চেতনা ছড়িয়ে দেয় সর্বস্তরে।
মহান ভাষা আন্দোলনের বাঙালির স্বাধিকার চেতনার যে বীজ অঙ্কুরিত হয় তাই পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের অহংকার। বিশ্বের দরবারে ভাষাপ্রেমী জাতি হিসেবে চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমে অনন্য গৌরবের অধিকারী হয়েছি আমরা একুশের মাধ্যমেই। একুশ আমাদের চেতনায় চির অমর, চির ভাস্বর।
সময়ের আলো/জেডআই