আমাদের মাঝে শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছে পবিত্র রমজান। রমজান মানবিকতা, আত্মসংযম ও তাকওয়ার মাস। পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। এই তাকওয়া অর্জনের অন্যতম পথ হলো দান-সদকা। কারণ দান মানুষের হৃদয়কে কৃপণতা থেকে মুক্ত করে, সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করে। রমজানে দান-সদকা, জাকাত ও ফিতরার চর্চা বিশেষ গুরুত্ব পায়। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যা কিছু কল্যাণমূলক ব্যয় করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭৩)
রমজানে নবীজি (সা.)-এর দানশীলতার বর্ণনা করতে গিয়ে সাহাবিগণ বলেন, রমজানে তিনি ছিলেন প্রবহমান বাতাসের চেয়েও অধিক উদার। এই ঐতিহ্য মুসলিম সমাজে দানের সংস্কৃতিকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়, নৈতিক দায়িত্বে পরিণত করেছে। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি শস্যদানা, যা সাতটি শিষ উৎপন্ন করে, প্রতিটি শিষে একশ দানা’ (সুরা বাকারা : ২৬১)। এখানে দানের সওয়াবকে বহুগুণ বৃদ্ধির বিষয়টি প্রতীকী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। রমজানে এ সওয়াব আরও বৃদ্ধি পায়। কারণ এটি রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস।
ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হলো জাকাত। কুরআনে বহু স্থানে সালাতের সঙ্গে জাকাতের উল্লেখ এসেছে, ‘সালাত কায়েম করো এবং জাকাত প্রদান করো’ (সুরা বাকারা : ৪৩)। ‘জাকাত’ শব্দের অর্থ বৃদ্ধি ও পবিত্রতা। অর্থাৎ জাকাত সম্পদকে শুদ্ধ করে এবং সমাজে বরকত আনে। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের ওপর বছরে ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত আদায় করতে হয়। জাকাতের প্রাপকদের আটটি শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারীগণ, অন্তর সংযোজনে, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফির। এটি একটি সুসংগঠিত সামাজিক কল্যাণব্যবস্থা।
রমজানে অনেকেই জাকাত আদায় করেন। যদিও জাকাত নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে আবদ্ধ নয়, তবু রমজানের বরকতের কারণে অনেকে এ মাসে হিসাব সম্পন্ন করেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো জাকাতের সঠিক হিসাব ও যথাযথ প্রাপকের কাছে পৌঁছানো। সদকা ফরজ নয়, এটি নফল ইবাদত। তবে কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তা ভালো; আর গোপনে গরিবকে দাও, তা তোমাদের জন্য উত্তম’ (সুরা বাকারা : ২৭১)। এ আয়াত দানের নৈতিকতা শিক্ষা দেয়, প্রদর্শন নয়, ইখলাসই মূল। হাদিসে এসেছে, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়া দান করবেন। তাদের একজন সে ব্যক্তি, যে এমনভাবে সদকা দেয় যে তার ডান হাত যা ব্যয় করে, বাম হাতও তা জানে না (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। গোপন দান আত্মাকে শিরক ও রিয়া থেকে রক্ষা করে।
রমজানের শেষে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করা ওয়াজিব। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ফিতরাকে রোজাদারের অশালীন কথা ও ত্রুটি থেকে পবিত্রতার মাধ্যম এবং দরিদ্রদের খাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এর উদ্দেশ্য দ্বিমুখী, রোজার ঘাটতি পূরণ এবং ঈদের আনন্দে দরিদ্রদের অংশীদার করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘তোমরা কখনো পূর্ণ নেকি লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা প্রিয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করো’ (সুরা ইমরান : ৯২)। এই আয়াত আমাদের শেখায়, দান তখনই অর্থবহ, যখন তা হৃদয়ের গভীর থেকে আসে এবং প্রিয় জিনিস ত্যাগের মানসিকতা থাকে। দান মানুষের হৃদয় থেকে লোভ ও কৃপণতা দূর করে। সুরা হাশরের ৯ নম্বর আয়াতে আনসারদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অগ্রাধিকার দিতেন। এটি ইসার বা পরার্থপরতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
দান-সদকা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার একটি কাঠামোগত পদ্ধতি। ইসলাম সম্পদকে কেবল ব্যক্তিগত মালিকানা হিসেবে দেখে না, এটি আল্লাহর আমানত। কুরআন সতর্ক করে, যেন সম্পদ কেবল তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয় (সুরা হাশর : ৭)। এ আয়াত স্পষ্ট করে, অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ইসলামের একটি মৌলিক লক্ষ্য। রমজানে দান-সদকা সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি জোরদার করে। ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে রোজাদার গরিবের প্রতি সহমর্মী হয়। ফলে দান কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি সামাজিক বন্ধনের পুনর্গঠন। আমাদের দান কি কেবল মাসব্যাপী সাময়িক সহায়তায় সীমাবদ্ধ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে? অনেক সময় দেখা যায়, রমজানে বিপুল পরিমাণ দান করা হলেও বছরজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব থাকে। ফলে দানের প্রভাব স্থায়ী হয় না। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা দান করে খোঁটা দেওয়া ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদকা নষ্ট করো না’ (সুরা বাকারা : ২৬৪)। অর্থাৎ দান করে প্রাপকের মর্যাদাহানি করলে সওয়াব বিনষ্ট হয়। রমজানে দান-সদকা হতে হবে বিনয়, ইখলাস ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে।
প্রকৃত দান সেটাই, যা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে এবং তার সম্মান অক্ষুণ্ন রাখে। যদি জাকাত-সদকা সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়, তবে এটি জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি ওয়েলথ রিডিস্ট্রিবিউশন বা সম্পদের পুনর্বণ্টন। ধনীদের অব্যবহৃত সম্পদের একটি অংশ দরিদ্রের কাছে পৌঁছালে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, স্থানীয় বাজার সচল হয় এবং অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। অনেক দেশে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ফান্ড দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর হয়েছে। আমাদের দেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জাকাত বোর্ড, সামাজিক কল্যাণ সংস্থা ও মসজিদভিত্তিক তহবিল রয়েছে। কিন্তু এগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, ডেটাভিত্তিক তালিকা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি- যেমন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি।
দান-সদকার ক্ষেত্রে একটি নৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো প্রদর্শনপ্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও দিয়ে দান প্রচার অনেক সময় প্রাপকের মর্যাদাহানি ঘটায়। ইসলাম দানে গোপনীয়তাকে উৎসাহিত করেছে, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তা ভালো; আর গোপনে গরিবকে দাও, তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম’ (সুরা বাকারা : ২৭১)। ডিজিটাল যুগে দানের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ফান্ডরেইজিং ও ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমে এবং তহবিল ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। তবে প্রতারণা ও ভুয়া সংস্থার ঝুঁকিও থাকে। তাই দান করার আগে সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই জরুরি। কুরআন-হাদিসের আলোকে রমজানের দান-সদকা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি তাকওয়া অর্জনের কার্যকর মাধ্যম। জাকাত সম্পদকে পবিত্র করে, সদকা হৃদয়কে কোমল করে, আর ফিতরা রোজাকে পরিপূর্ণতা দেয়। আজ আমাদের প্রয়োজন দানকে সাময়িক আবেগ নয়, বরং কুরআন প্রদর্শিত সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি হিসেবে দেখা। তা হলেই রমজান হবে আত্মশুদ্ধি ও মানবকল্যাণের সমন্বিত মহোৎসব, যেখানে দান কেবল হাতের কাজ নয়, হৃদয়ের ইবাদত।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/জেডআই