মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সমতলের জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতির সংকটের বিষয়টি সামনে আসার পরপরই আলোচনায় নড়ে বসে গাইবান্ধার নাগরিক সমাজ।
দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকায় ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ‘মাতৃভাষা সংকটে চার নৃগোষ্ঠী’ শিরোনামে সেই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করেই রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাইবান্ধা শহরে আয়োজন করা হয় মতবিনিময় সভা। সভা থেকে জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জোর দাবি তোলা হয়।
নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ, গাইবান্ধার আয়োজনে শহরের অবলম্বন কনফারেন্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক সভায় বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় জনমত তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বাস্তব উদ্যোগ।
শুরুতে ভাষা শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
জনউদ্যোগ গাইবান্ধা জেলার আহ্বায়ক অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুমের সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব প্রবীর চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
আলোচনায় উঠে আসে, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার রাজাবিরাট, জয়পুর, মাদারপুর, তুলট ও তল্লাপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামে সাঁওতাল, ওরাওঁ, মাহালী ও মালপাহাড়ি সম্প্রদায়ের প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন। সমতলের বাঙালি অধ্যুষিত পরিবেশে থেকেও তারা নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, উৎসব ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ধারণ করে রেখেছেন।
বক্তারা বলেন, এসব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা এখনো বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ভাষাগুলো মূলত মৌখিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, পাঠ্যপুস্তক ও সরকারি সহায়তার অভাবে সেগুলো বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা চালুর উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজেদের ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এর ফলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে লোকজ জ্ঞান, ইতিহাস, গান, আচার ও সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চেতনার।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, সমতলের আদিবাসীরা দেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ। ভূমিহীনতা, সামাজিক বৈষম্য ও প্রান্তিকতার কারণে তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতীয় জীবনে অবদান রাখলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত এমন অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
সভা থেকে জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন, আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন, মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রাথমিক শিক্ষা চালু, সাংস্কৃতিক গবেষণা ও দলিল সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভূমির অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা মানে দেশের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য রক্ষা করা। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার পর নাগরিক সমাজের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে জনজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এখন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি জিয়াউল হক কামাল, গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি রেজাউন্নবী রাজু, কোষাধ্যক্ষ রজতকান্তি বর্মন, সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম বাবু, হেদায়েতুল ইসলাম বাবু, কায়সার রহমান রোমেল, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদ নেতা গোলাম রব্বানী মুসা, সংস্কৃতিকর্মী মানিক বাহার, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক শিরিন আকতার, নারী নেত্রী অঞ্জলী রানী দেবী, মাজেদা খাতুন, আদিবাসী যুব নেত্রী সুরভী মার্ডি, স্বরস্বতি মালপাহাড়ী প্রমুখ।
সময়ের আলো/আরবিএন