রমজান মাস এলেই অনেক গর্ভবতী মায়ের মনে একটি প্রশ্ন ঘোরে- আমি কি রোজা রাখতে পারব? রোজা রাখলে বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে না তো? বিষয়টি যেমন ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত, তেমনি জড়িত মা ও গর্ভের সন্তানের সুস্থতার সঙ্গে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন সচেতনতা ও সঠিক তথ্যের।
ইসলামে রোজা প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীর জন্য ফরজ। এই ফরজ কাজটি আমরা সবাই করতে চাই। তবে অসুস্থতা বা বিশেষ শারীরিক অবস্থায় ছাড়ের বিধানও রয়েছে। গর্ভাবস্থায় রোজা রাখা যাবে কি না, তা সবার ক্ষেত্রে এক নিয়মে নির্ধারিত হয় না। এটি নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, গর্ভের বয়স এবং কোনো জটিলতা আছে কি না এসব বিষয়ের ওপর।
আপনি যদি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন তা হলে রোজা রাখতে পারবেন এতে বাচ্চার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না, কিছু সংখ্যক নারী গর্ভাবস্থায় ভয়ের কারণেই রোজা থেকে বিরত থাকেন।
গর্ভবতী মায়ের রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও অন্যান্য পরীক্ষার ফল যদি স্বাভাবিক থাকে এবং চিকিৎসক ঝুঁকি না দেখেন, তা হলে অনেক ক্ষেত্রে রোজা রাখা সম্ভব। সাধারণভাবে সুস্থ গর্ভাবস্থায় রোজা রাখলে শিশুর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এমন প্রমাণ সব ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। তবে এটাও ঠিক, গর্ভাবস্থায় শরীরের চাহিদা বেড়ে যায়। তাই রোজা রাখলে বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি।
সুস্থ মানুষ রোজা রাখার সময় যেমন বদহজম, দুর্বলতা, গ্যাস বা পানিশূন্যতার মতো সমস্যা অনুভব করতে পারেন, তেমনি গর্ভাবস্থায়ও এসব সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ইফতার ও সেহরির খাবার নির্বাচনে সচেতন হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইফতার ও সেহরির খাবার নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইফতারের সময় অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল-মসলা জাতীয় খাবার থেকে বিরত থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবারের তালিকা বেছে নিতে হবে।
খাবার ও পানীয়তে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
শরীরে যেন পানি শূন্যতা না হয় সে জন্য ইফতারের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। একসঙ্গে অনেক পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করা ভালো। ফল, লেবু পানি, ডাবের পানি বা ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর পানীয় এ সময় শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, তেল-মসলাযুক্ত ও ভারী খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলো বদহজম, অস্বস্তি ও অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়াতে পারে।
সেহরিতে এমন খাবার রাখুন যাতে শর্করা, প্রোটিন ও আঁশ থাকে। যেমন- ভাত বা রুটি, ডাল, সবজি, ডিম, দুধ ইত্যাদি। এসব খাবার দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাতে সহায়তা করে। অতিরিক্ত চা ও কফি পরিহার করা ভালো, কারণ এগুলো শরীর থেকে পানি বের করে দিতে পারে।
শরীরকে গুরুত্ব দিন
রোজা রাখার সময় নিজের শরীরের দিকে নজর রাখা জরুরি। যেমন- মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, তীব্র পিপাসা, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা গর্ভের শিশুর নড়াচড়া কম মনে হওয়া এসব লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা যাবে না। এমন কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে রোজা ভেঙে বিশ্রাম নিতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় যদি কোনো সমস্যা থাকে যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তশূন্যতা, বাচ্চার ওজন কম বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থেকে থাকে তা হলে রোজা না রাখাই নিরাপদ। এসব পরিস্থিতিতে রোজা রাখার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
বিশেষ করে যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকা ও ওষুধের সময়সূচি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক করা জরুরি। নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ কথাও মনে রাখা দরকার, শরিয়তে অসুস্থতা বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। মা ও সন্তানের নিরাপত্তা সর্বাগ্রে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক যদি নিষেধ করেন বা শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তা হলে রোজা না রাখা গুনাহ নয়। পরে সুস্থ হলে কাজা আদায় করার সুযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের শরীরের তুলনা না করা। একজন গর্ভবতী মা স্বাচ্ছন্দ্যে রোজা রাখতে পারছেন মানেই আরেকজনও পারবেন এমন নয়। প্রত্যেকের গর্ভাবস্থা আলাদা। মায়ের সুস্থতা মানেই সন্তানের নিরাপদ বেড়ে ওঠা।
স্তন্যদানকারী মায়ের রোজা
শুধু গর্ভবতী মায়েরাই নন, অনেক স্তন্যদানকারী মায়ের মনেও একই প্রশ্ন আসে- বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় রোজা রাখা যাবে কি না? এর উত্তরও নির্ভর করে মায়ের শারীরিক অবস্থা, দুধের পরিমাণ এবং শিশুর বয়সের ওপর। যদি মা সুস্থ থাকেন, ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত খাবার ও পানি গ্রহণ করতে পারেন এবং শিশুর ওজন ও বেড়ে ওঠা স্বাভাবিক থাকে, তা হলে অনেক ক্ষেত্রে রোজা রাখা সম্ভব।
তবে খেয়াল রাখতে হবে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে কিছু মায়ের দুধের পরিমাণ সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু সম্পূর্ণভাবে মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।
ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি, দুধ, স্যুপ ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া জরুরি। প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, সবজি ও ফল খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো। অতিরিক্ত চা-কফি এড়িয়ে চলা উচিত।
যদি দেখা যায় শিশুর প্রস্রাব কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে না, অস্বাভাবিক কান্না করছে বা দুধের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে, তা হলে রোজা ভেঙে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ইসলামি বিধান অনুযায়ী মা বা শিশুর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকলে রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে।
সবচেয়ে ভালো হয় রোজা শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ মায়ের সুস্থতা ও শিশুর পুষ্টিই এখানে মূল বিষয়। রমজানে ইবাদতের পাশাপাশি নিজের শরীরের যত্ন নেওয়াও দায়িত্বের অংশ। সচেতন সিদ্ধান্তই পারে মা ও সন্তানের সুস্থতা নিশ্চিত করতে।
লেখক : সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন, মেডিকেল অফিসার
সময়ের আলো/কেএইচও