যুদ্ধের ভারে ন্যুব্জ রাশিয়া

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছর পর রাশিয়ার ভেতরে তার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সীমান্ত থেকে শত শত কিলোমিটার

2026-02-23T22:59:19+00:00
2026-02-23T22:59:19+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
বিবিসির বিশ্লেষণ
যুদ্ধের ভারে ন্যুব্জ রাশিয়া
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম   (ভিজিট : ৭৯)
পর্তুগালের লিসবনে ‘চলুন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করি’ স্লোগানে শিশুদের সুরক্ষার দাবিতে সমাবেশে অংশ নেন ইউক্রেনের বাসিন্দারা। ছবি : সংগৃহীত
ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর চার বছর পর রাশিয়ার ভেতরে তার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সীমান্ত থেকে শত শত কিলোমিটার দূরের শহরেও এখন যুদ্ধের ছাপ। নিয়োগের পোস্টার, নিহত সৈন্যদের স্মারকচিত্র, ড্রোন হামলার আশঙ্কায় তৈরি আশ্রয়কেন্দ্র, আর বাড়তে থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। সীমান্তঘেঁষা লিপেৎস্ক অঞ্চলের ছোট শহর ইয়েলেতসে ঘুরে দেখা যায় : যুদ্ধ শুধু ফ্রন্টলাইনে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে।

চার বছর আগে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, ক্রেমলিন ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। মস্কো একে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে আখ্যা দেয়। রাশিয়ার নেতৃত্ব ভেবেছিল, এটি হবে সংক্ষিপ্ত ও সফল এক সামরিক অভিযান। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী তা হয়নি। আজ চার বছর পরও যুদ্ধ চলছে। এর স্থায়িত্ব নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ার’-এর সময়কালকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেশের বহু শহর-গ্রামে এর প্রভাব দৃশ্যমান।

মস্কো থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইয়েলেতস শহর। শীতের সকালে শহরটি যেন রূপকথার দৃশ্য। সোনালি গম্বুজওয়ালা অর্থডক্স গির্জা, জমে যাওয়া নদীতে বরফের ওপর মাছ ধরছেন মানুষ। কিন্তু এই শান্ত দৃশ্যের আড়ালে রয়েছে যুদ্ধের বাস্তবতা। নদীর পাড়ে বড় একটি বিলবোর্ডে দেখা যায় সেনাবাহিনীতে যোগদানের আহ্বান। ইউক্রেনে লড়তে সই করলে এককালীন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ড সমমূল্যের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কাছেই আরেক পোস্টারে কালাশনিকভ তাক করা এক রুশ সৈন্যের ছবি। স্লোগান, ‘আমরা সেখানে আছি, যেখানে আমাদের থাকা প্রয়োজন।’

রুশ কর্তৃপক্ষ এই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে জানা যায়, রাশিয়া বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইয়েলেতসের একটি ৯ তলা অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দেয়ালজুড়ে বিশাল দেয়ালচিত্রে স্থানীয় পাঁচ রুশ সৈন্যের মুখাবয়ব আঁকা; যারা ইউক্রেনে নিহত হয়েছেন। ওপরে লেখা- ‘রাশিয়ার বীরদের গৌরব।’


মুরালের সামনে কথা হয় ইরিনা নামের এক নারীর সঙ্গে। তিনি বাসস্টেশনে টিকেট সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। ‘আমার বন্ধুর স্বামী সেখানে মারা গেছেন। আমার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে, তার নাতিও,’ বলেন তিনি। ‘অনেক মানুষ মারা গেছে। ছেলেগুলোর জন্য আমার কষ্ট হয়।’ ইরিনা নিজেও আর্থিক চাপে আছেন। ‘ইউটিলিটি বিল আমাদের শ্বাসরোধ করছে। দাম আমাদের পিষে দিচ্ছে। টিকে থাকা কঠিন।’ তবু তিনি সামনের সারির সৈন্যদের জন্য সহায়তার প্যাকেট তৈরিতে অংশ নেন। যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেন না, তবে বিভ্রান্তি আছে তার কণ্ঠে। ‘গ্রেট প্যাট্রিয়টিক ওয়ারে আমরা জানতাম কেন লড়ছি। এখন আমরা কী জন্য লড়ছি, নিশ্চিত নই।’

ইয়েলেতস থেকে ইউক্রেন সীমান্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু যুদ্ধ কখনো কখনো আরও কাছের মনে হয়। লিপেৎস্ক অঞ্চলসহ রাশিয়ার বহু এলাকায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা হয়েছে। শহরের বাসস্টপ, পার্কে দেখা যায় কংক্রিটের জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র। আগে এগুলোর প্রয়োজন ছিল না। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের বেসমেন্টেও আশ্রয়কক্ষ নির্ধারিত আছে। ‘প্রায় প্রতি রাতেই সাইরেন বাজে,’ বলেন ইরিনা। ‘আমি বাইরে যাই না। আমরা করিডোরে দাঁড়াই, যেখানে জানালা নেই।’

শহরের অপ্রত্যাশিত জায়গাতেও যুদ্ধের চিহ্ন। এক প্যানকেক ক্যাফের নামের সাইনবোর্ডে লাতিন অক্ষর ‘ঠ’ ও ‘ত’- যুদ্ধের প্রতীক। নিচে লেখা- ‘একটা প্যানকেক নিন, তারপর পুরো বিশ্ব।’

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বছর সেন্ট পিটার্সবার্গে বলেছিলেন, ‘যেখানে রুশ সৈন্যের পা পড়ে, সেটাই আমাদের।’ দুই বছর আগে মস্কোর এক ইলেকট্রনিক বিলবোর্ডে দেখা যায় তার আরেক উক্তি : ‘রাশিয়ার সীমান্ত কোথাও শেষ হয় না।’

যুদ্ধের আর্থিক প্রভাবও স্পষ্ট। বাজেট ঘাটতি বাড়ছে, অর্থনীতি স্থবির। সরকার ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২২ শতাংশ করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, অতিরিক্ত রাজস্ব ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’ খাতে ব্যয় হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জনগণকে বোঝানো হচ্ছে। উপস্থাপক দিমিত্রি কিসেলেভ বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের সময়ে বাস করছি, পশ্চিম আমাদের ওপর এই যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। আমাদের জিততেই হবে। যুদ্ধ বাজেট ছাড়া উপায় নেই।’

ছোট ব্যবসায়ীরা চাপে। ইয়েলেতসের এক বেকারিতে টাটকা কিশমিশ রুটি, স্কোন আর ক্রিম পেস্ট্রির গন্ধ মন ভরায়। কিন্তু মালিক আনাস্তাসিয়া বাইকোভা বলেন, ‘আমাদের দাম বাড়াতে হয়েছে। 


ইউটিলিটি বিল, ভাড়া, কর : সব বেড়েছে। ভ্যাট বৃদ্ধিতে উপকরণের দামও বেড়েছে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘ধরুন আমরা বন্ধ হয়ে গেলাম। আমাদের বেকারি, সামনের রেস্টুরেন্ট। আমরা শহরটাকে সুন্দর রাখার চেষ্টা করি। আমরা না থাকলে কী থাকবে? শুধু ধূসর অন্ধকার।’

লিপেৎস্ক শহরে, ইয়েলেতস থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে, আরও সামরিক পোস্টার, আরও আশ্রয়কেন্দ্র চোখে পড়ে। এক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সিঁড়িঘরে দেখা হয় পেনশনভোগী ইভান পাভলোভিচের সঙ্গে। তার মূল উদ্বেগ একটি লিক হওয়া পাইপ, দেয়ালে জমে থাকা বরফ আর বিকল লিফট। দাম বাড়া ও ইউটিলিটি বিল নিয়ে ক্ষুব্ধ তিনি। যুদ্ধকে দায়ী করেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি যদি তরুণ হতাম, যুদ্ধে যেতাম। 

বিশেষ সামরিক অভিযান চমৎকার। শুধু দাম বাড়ছে। পেনশন বাড়ে, কিন্তু দাম আরও বেশি বাড়ে। তা হলে আমি কী পেলাম? কিছুই না।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘অবশ্যই, এই অভিযান না থাকলে আমরা আরও স্বচ্ছন্দে থাকতাম। অনেক টাকা খরচ হয়। মানুষও যা পারে দিচ্ছে। সাহায্য করতে হবে। আমি অভিযোগ করছি না।’

চার বছর পর রাশিয়ার বহু মানুষ অনুভব করছেন- জীবন কঠিন হয়ে উঠছে। কিন্তু খুব কম মানুষই বিশ্বাস করেন যে তারা পরিস্থিতি বদলাতে পারবেন। যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করছে। আশাবাদ কম। অনেকেই কেবল সময় পার করছেন, ভালো দিনের আশায়।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   বিবিসি  রাশিয়া 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: