গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্রবেষ্টিত চরাঞ্চলে এবার মরিচ চাষে বিপুল লাভের মাধ্যমে কৃষকদের জীবন-জীবিকা বদলাচ্ছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি করে অনেক কৃষক ইতিমধ্যে লাখপতি হয়েছেন। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বালুমাটির খেত এখন সবুজ মরিচে ভরা, যা নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮২০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। ভাদ্র মাসের শেষভাগ ও আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ মরিচ চাষের উপযুক্ত সময়। পৌষ-মাঘ মাসে শুরু হয় বাজারজাতকরণ। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার ফলন আশানুরূপের চেয়েও বেশি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম জিগাবাড়ি গ্রামের কৃষক সাইদুর রহমান এ বছর ৩ বিঘা জমিতে বগুড়ার দেশি লম্বা জাতের মরিচ চাষ করেছেন। পর্যাপ্ত গোবর সার ব্যবহার করায় জমিতে হয়েছে বাম্পার ফলন।
তিনি জানান, ৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৯০ হাজার টাকা খরচ করে উৎপাদন করেছেন প্রায় ১০০ মণ কাঁচা মরিচ। বাজারদর প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা ধরে বিক্রি করলে আয় দাঁড়াবে প্রায় ৪ লাখ টাকা। শুকিয়ে নিলে ৩০-৩৩ মণ শুকনা মরিচ পাওয়া যাবে, যা প্রতি মণ ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হলে আয় হতে পারে ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে শ্রম ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে অনেক কৃষক কাঁচা মরিচ বিক্রি করে সেই অর্থ ভুট্টা ও বোরো ধান চাষে বিনিয়োগ করছেন।
শুধু সাইদুর রহমান নন, একই এলাকার শতাধিক কৃষক এবার মরিচ চাষ করেছেন।
ফজলুপুর ইউনিয়নের খাটিয়ামারী গ্রামের লাল মিয়া জানান, ১ বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করে তিনি প্রতিবছর ভালো লাভ করছেন এবং সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন।
ফুলছড়িতে মরিচের অন্যতম বড় হাট বসে। নদী সংলগ্ন হওয়ায় এখানে প্রচুর মরিচ আসে। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, রংপুর, বগুড়া ও জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা কাঁচা মরিচ কিনতে আসেন।
কৃষকরা জানান, ফুলছড়ির মরিচের ঝাল বেশি হওয়ায় চাহিদাও বেশি।
হাটের ইজারাদার বলেন, প্রতি হাটে প্রায় ১৪০-১৫০ মণ কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়।
গজারিয়া ইউনিয়নের কৃষক ফিরোজ আহমেদ জানান, কম সার লাগে, খরচও কম, তবুও লাভ বেশি। তাই চাষিরা মরিচ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তিনিও ৩ বিঘা জমিতে মরিচ আবাদ করেছেন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব জমি না থাকলেও অনেকেই বর্গা নিয়ে মরিচ চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছে। সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে এবার ফলন হয়েছে বাম্পার।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মিন্টু মিয়া বলেন, এ বছর ৮২০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের আগ্রহের কারণে ফলন ভালো হয়েছে। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় চরাঞ্চলের কৃষকরা দিন দিন মরিচ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
জেলা কৃষি প্রশিক্ষণ অফিসার কৃষিবিদ আসাদুজ্জামান বলেন, চরাঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু মরিচ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মরিচ দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চরে মরিচ এখন শুধু ফসল নয়, এটি হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলের কৃষকদের ভাগ্য বদলের প্রতীক।
সময়ের আলো/আরবিএন