দখল-দূষণে বিপন্ন শহিদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত খাল

মেহেদী হাসান লিটন শ্রীপুর, গাজীপুর

সারাদেশ

গাজীপুরের শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌক্কার খাল একটা সময়ে ছিল সেচনির্ভর কৃষির প্রাণধারা। একদিকে এটি কৃষকের সেচের প্রধান ভরসা ছিল, অন্যদিকে জড়িয়ে

2026-02-25T23:54:16+00:00
2026-02-25T23:54:16+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
দখল-দূষণে বিপন্ন শহিদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত খাল
মেহেদী হাসান লিটন শ্রীপুর, গাজীপুর
প্রকাশ: বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম 
শিল্পবর্জ্য ও দখলের চাপে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌক্কার খাল। সংগৃহীত ছবি
গাজীপুরের শ্রীপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌক্কার খাল একটা সময়ে ছিল সেচনির্ভর কৃষির প্রাণধারা। একদিকে এটি কৃষকের সেচের প্রধান ভরসা ছিল, অন্যদিকে জড়িয়ে আছে দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শহিদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস। কালের পরিক্রমায় আজ গুরুত্বপূর্ণ সেই খাল শিল্পবর্জ্য ও দখলের চাপে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। 

প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি স্থানীয়দের কাছে গড়গড়িয়া খাল নামেও পরিচিত। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দোখলা বাজার এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে ছাপিলাপাড়া পেরিয়ে ভাংনাহাটি গ্রামের কৃষিজমিতে মিলিত হয়েছে খালটি। সময়ের প্রবাহে সেই জীবন্ত জলাধার আজ ভরাট, দূষণ ও দখলের করাল গ্রাসে বিপর্যস্ত।

ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য মুহূর্ত : স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছিলেন। শ্রমিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাটি কাটার সেই দৃশ্য আজও প্রবীণদের স্মৃতিতে অমলিন। 

তৎকালীন শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হেলিম জানান, সে সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন ইব্রাহিম মণ্ডল। শ্রমের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় খাল খননের কাজ শুরু হয়। চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পর পদাধিকারবলে দায়িত্ব পান আব্দুল হেলিম। অতীতের সেই স্বণার্লি ক্ষণের স্মৃতিচারণা করে আব্দুল হেলিম বলেন, ছাপিলাপাড়ায় গাড়ির বহর নিয়ে এসে রাষ্ট্রপতি  জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল চালান। তাকে মাটি কাটতে দেখে শ্রমিকরা নতুন উদ্দীপনা পায়। 

খালের বর্তমান দুরবস্থায় আক্ষেপ প্রকাশ করে আব্দুল হেলিম বলেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত খালটি সময়ের পরিক্রমায় আজ দখল ও দূষণে মৃতপ্রায়। খালটির বড় একটি অংশ দখল ও দূষণের শিকার হওয়ায় অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। আব্দুল হেলিম জানান, একটা সময়ে এই খালের পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া হতো। বোরো ও আমন ধানের আবাদ হতো এই খালের পানি দিয়ে। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন খালের পানি তলানিতে এসে জমেছে। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানি উপচে পড়ে। খালের পানি দুই পাড় গড়িয়ে আশপাশের বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া : শ্রীপুর বিএনপির আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির সরকার বলেন, খালটি ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে। অনেক জায়গায় পাড় কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি জরুরি ভিত্তিতে পুনর্খনন ও শিল্পকারখানাকে ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহারে বাধ্য করার দাবি জানান।

এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে গাজীপুর-৩ আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, খালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু আরও বলেন, এটি মানুষের প্রত্যাশা, পাশাপাশি ঐতিহাসিক দায়িত্বও বটে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি শুধু একটি খাল নয়, আমাদের ইতিহাসের অংশ। খালটি সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।

খালপাড়ের বাসিন্দা শামিম আহমেদ জানান, শৈশবে এই খালের পানি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিতাম। খালে মাছও ধরতাম। কিন্তু এখন সেই খাল দুর্গন্ধময় বর্জ্যে ভরা।

পরিবেশগত শঙ্কা : পরিবেশ সংগঠন নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, শ্রীপুরের অধিকাংশ খালই এখন শিল্পবর্জ্যরে আধার হয়ে উঠেছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে কৃষক ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তলানি জমে খালের নাব্যতা নষ্ট হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা : সরেজমিন আলাপকালে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সেতুর উজানে প্রায় ৫০০ গজ এলাকায় একটি কারখানা নির্মাণের সময় খালের অংশবিশেষ ভরাট করা হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের অন্তত ২০টি শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি খালে নিঃসৃত হচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, যথাযথ পুনর্খনন, দখলমুক্তকরণ এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে চৌক্কার খাল আবারও কৃষি সেচ, মাছ চাষ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

তারা বলছেন, ইতিহাসের সাক্ষী, স্মৃতিবিজড়িত এই খাল এখন পুনর্জীবনের অপেক্ষায়। খালটি যাতে আবারও জেগে ওঠে কৃষকের আশার জলধারা হয়ে সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যত দ্রুত সম্ভব যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরি।  

সময়ের আলো/আআ



  বিষয়:   দখল  দূষণ  বিপন্ন  শহিদ  জিয়া  স্মৃতি  খাল  গাজীপুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: