পলিমাটির চরে পর্যটনের সম্ভাবনা

গাইবান্দা প্রতিনিধি

সারাদেশ

বর্ষা বিদায় নিলে নদ-নদীর উত্তাল স্রোত ধীরে ধীরে শান্ত হয়। দূর থেকে তখন গাইবান্ধার চরগুলোকে মনে হয় ভাসমান সবুজ দ্বীপ

2026-02-26T16:55:10+00:00
2026-02-26T16:55:10+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
পলিমাটির চরে পর্যটনের সম্ভাবনা
গাইবান্দা প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫৫ পিএম 
চরের দৃশ্য। ছবি : সময়ের আলো
বর্ষা বিদায় নিলে নদ-নদীর উত্তাল স্রোত ধীরে ধীরে শান্ত হয়। দূর থেকে তখন গাইবান্ধার চরগুলোকে মনে হয় ভাসমান সবুজ দ্বীপ যেন জলের বুকে নীরব বিস্তার। শরতের হালকা বাতাসে ঢেউ তোলে সাদা কাঁশফুল, যেন নদীতীরে প্রকৃতি নিজেই সাজিয়েছে উৎসবের মঞ্চ। হেমন্তের সকালে কুয়াশা কাটতেই পলিমাটির ওপর রোদের ঝিলিক পড়ে। মিষ্টি কুমড়ার হলুদ ফুল ঝলমল করে ওঠে, সারি সারি পেঁয়াজ-রসুনের চারা মাথা তোলে, বাদামক্ষেতে কৃষকের ব্যস্ত পদচারণায় প্রাণ ফিরে পায় মাঠ। কোথাও ধানের শীষে হেলে পড়া রোদ, কোথাও ভুট্টার সবুজ দেয়াল সব মিলিয়ে এক বিস্তীর্ণ জীবন্ত ভূদৃশ্য।

নদীর ওপারে আরেকটি চর, তারও ওপারে আরেকটি। এভাবেই তিস্তা নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদী বেষ্টিত সুন্দরগঞ্জ উপজেলা, গাইবান্ধা সদর উপজেলা, ফুলছড়ি উপজেলা ও সাঘাটা উপজেলা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে ১৬৫টি চর ও দ্বীপচর। দীর্ঘদিন ধরে যেগুলোর পরিচয় ছিল অনিশ্চয়তা, বন্যা আর ভাঙনের গল্পে; সেগুলোকেই এখন নতুন চোখে দেখা হচ্ছে কৃষি পর্যটনের সম্ভাবনাময় এক ভূখণ্ড হিসেবে।

গাইবান্ধার এসব চরাঞ্চলে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। নদীর স্রোত আর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে তারা পলিমাটিকে পরিণত করেছে উর্বর ফসলভূমিতে। বছরে দুই থেকে তিন ফসল ফলানো এখন অনেক চরে নিয়মিত ঘটনা। ধান, ভুট্টা, মরিচ, চিনাবাদাম, তিল, শাকসবজি, মিষ্টি কুমড়া আবাদের ফলে মৌসুম বদলের সঙ্গে বদলে যায় জমির রং। 

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসব চরে বছরে ২০টির বেশি প্রজাতির ফসল উৎপাদিত হয়। পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টি কুমড়া ও বাদামের আবাদ বাড়ছে। কোথাও গবাদিপশু পালন, কোথাও দুধ উৎপাদন। অর্থাৎ কৃষি এখানে শুধু জীবিকা নয়, সম্ভাবনার অর্থনীতি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জিইউকের প্রধান নির্বাহী ও চর গবেষক এম. আবদুস সালাম বলেন, এই কৃষিনির্ভর জীবনযাপনকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা থেকেই কৃষি পর্যটন বা ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ এর যাত্রা শুরু হবে। পর্যটকেরা সরাসরি কৃষিজমি, ফসল তোলা, গ্রামীণ জীবনধারা, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত হবে। শহরের মানুষ সকালে খেত পরিদর্শন করবে, কৃষকের সঙ্গে মাঠে নেমে ফসল তুলবে, দুপুরে খাবে খেতের টাটকা সবজি, বিকেলে নদীতে নৌভ্রমণ করবে আর সূর্যাস্ত দেখবে চরপাড়ে দাঁড়িয়ে। অভিজ্ঞতাভিত্তিক এই ভ্রমণই কৃষি পর্যটনের মূল আকর্ষণ হতে পারে।

কৃষিবিদ সাদেকুল ইসলাম মনে করেন, চরাঞ্চলের বড়ো শক্তি হলো অর্গানিক বা বিষমুক্ত চাষের সম্ভাবনা। নদীর পলিমাটি প্রাকৃতিকভাবে উর্বর হওয়ায় তুলনামূলক কম রাসায়নিক ব্যবহারেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। অনেক কৃষক এখন পরীক্ষামূলকভাবে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছেন। যদি এই চাষাবাদকে ব্র্যান্ডিং করা যায়, তবে ‘চরের অর্গানিক পণ্য’ আলাদা পরিচিতি পেতে পারে। পর্যটকরা সরাসরি খেত থেকে টাটকা সবজি ও ফল কিনতে পারবেন এতে কৃষকের লাভ বাড়বে, মধ্যস্বত্বভোগী কমবে।

সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া চরের এক কৃষক আবদুল মান্নান বলেন, মানুষ যদি আসে, আমাদের খেত দেখে, ফসল নেয়, তাহলে আমাদের আয়ও বাড়বে। আমরা তো প্রতিদিনই কাজ করি, ওরা এসে দেখুক কীভাবে চাষ হয়।

তার কথায় ধরা পড়ে কৃষি পর্যটনের সামাজিক দিক ও কৃষিকে অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া।


ফুলছড়ির বালাশীঘাট এখনো গাইবান্ধার পরিচিত নদীকেন্দ্রিক ভ্রমণস্থল। ব্রহ্মপুত্রের তীরে দাঁড়িয়ে দূরের চরগুলোর দিকে তাকালে বিস্তীর্ণ বালুচর আর আকাশের মিলনরেখা চোখে পড়ে। ছুটির দিনে বহু মানুষ এখানে আসেন। 

স্থানীয়দের মতে, নিরাপদ জেটিঘাট, পরিকল্পিত নৌভ্রমণ, আবাসন ও স্যানিটেশন সুবিধা থাকলে বালাশীঘাটকে কেন্দ্র করে চরভিত্তিক কৃষি পর্যটনের রুট তৈরি করা সম্ভব। সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জের বিভিন্ন চরে মৌসুমি ফসলের মাঠ, গরু-মহিষের খামার, হাঁসের ঝাঁক সব মিলিয়ে গ্রামীণ অভিজ্ঞতার পূর্ণ প্যাকেজ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

কৃষি পর্যটন বা ‘এগ্রো-ট্যুরিজম’ প্রসঙ্গে লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক জহুরুল কাইয়ুম বলেন, সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। যোগাযোগব্যবস্থা এখনো বড়ো বাধা। অধিকাংশ চরে যেতে হয় নৌকায়; বর্ষায় স্রোত তীব্র, শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা কমে যায়। কোথাও ঘোড়ার গাড়ি, কোথাও মোটরসাইকেলই ভরসা। পাকা রাস্তা, নিরাপদ জেটিঘাট, জরুরি চিকিৎসা সুবিধা, মানসম্মত আবাসন সবই সীমিত। 

স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, রাস্তাঘাট ঠিক না হলে পর্যটক আসবে কীভাবে? আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

এ বিষয়ে পরিবেশ আন্দোলন গাইবান্ধার সভাপতি ওয়াজিউর রহমান রাফেল বলেন, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বড়ো বিবেচ্য বিষয়। প্রতিবছর বসতি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। অনিয়মিত বন্যা ও আকস্মিক স্রোত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝুঁকির ধারণা তৈরি করে। ফলে সরকারি সহায়তা ছাড়া বড়ো বিনিয়োগ এগোয় না। পরিকল্পিত চর উন্নয়ন, নদীশাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া কৃষি পর্যটনের টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়।

তবু আশার জায়গা আছে। কৃষি পর্যটনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি স্থানীয় মানুষ। চরবাসীরা অতিথিপরায়ণ। অনেক পরিবার হোমস্টে চালুর আগ্রহ দেখাচ্ছে। নারীরা ঘরে তৈরি পিঠা, দুধজাত পণ্য, শুঁটকি ও হস্তশিল্প বিক্রির সুযোগ পেতে পারেন। তরুণরা গাইড, নৌচালক, পরিবহণকর্মী বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হতে পারে। মৌসুমি কৃষিকাজের বাইরে বিকল্প আয় তৈরি হলে চরবাসীর জীবনমান উন্নত হবে।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, গাইবান্ধার চরাঞ্চলকে কৃষি-সংস্কৃতি-প্রকৃতিনির্ভর সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। মৌসুমি ফসল উৎসব, চরভিত্তিক কৃষি মেলা, পাখি পর্যবেক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্টাডি ট্যুর এসব উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান, যেখানে কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় সরকার ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করবে।

সরকারি পর্যায়ে বিশেষ প্রণোদনা, সহজ ঋণ, করসুবিধা এবং চরাঞ্চলের জন্য আলাদা উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও এগিয়ে আসতে পারেন। ছোট আকারের ইকো-রিসোর্ট, সৌরবিদ্যুৎনির্ভর কটেজ, পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এসব নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চল টেকসই পর্যটনের মডেল হতে পারে।

গাইবান্ধার ১৬৫ চর আজও সংগ্রামের প্রতীক। কিন্তু সেই সংগ্রামের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনার বীজ। পলিমাটির উর্বরতা, বিস্তীর্ণ সবুজের মাঠ, নদীর স্রোত আর মানুষের অধ্যবসায় সব মিলিয়ে এটি শুধু ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, এক সম্ভাবনাময় গল্প। দূরদর্শী পরিকল্পনা, সমন্বিত বিনিয়োগ ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা বেষ্টিত গাইবান্ধার এই চরভূমিই একদিন বাংলাদেশের কৃষি পর্যটনের নতুন মানচিত্র হয়ে উঠতে পারে।

সময়ের আলো/আরবিএন 


  বিষয়:   বর্ষা  নদ-নদী  গাইবান্ধা  চর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: