বছরের শুরু থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে বেড়েছে মশার দাপট। মশার যন্ত্রণায় শুধু রাতে নয় দিনেও অতিষ্ঠ নগরবাসী। সন্ধ্যার পর ঝাঁকে ঝাঁকে মশার আক্রমণ স্বাভাবিক জীবন বিষিয়ে তুলেছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। চলতি বছরেও তা অব্যাহত আছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ওষুধ ছিটানোর কথা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে কিন্তু নগরবাসীর অভিযোগ পরিচ্ছন্নকর্মীদের দেখা মেলে না। ফেব্রুয়ারি শেষ হতে চললেও নগরীর বড় অংশেই চসিক কর্মীদের পা পড়েনি। দেখা যায়নি মশক নিধনের কার্যকর তৎপরতা। বড় পরিসরে ফগার মেশিন নিয়ে ওষুধ ছিটানোর দৃশ্য চোখে তেমন পড়ে না। ভরাট নালা-নর্দমা সংস্কারে দৃশ্যমান কোনো কাজ নেই বললেই চলে। তবে চসিক বরাবরের মতো দাবি করে আসছে, ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। ছিটানো হচ্ছে মশক নিধনের নতুন ও পুরোনো ওষুধ। পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা ওয়ার্ড ভিত্তিক কার্যক্রম নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়া থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় আমেরিকান প্রযুক্তির লার্ভিসাইড বিটিআই ব্যবহারের তথ্য দিয়েছে চসিক। গত বছরের ১ ডিসেম্বর নগরীর ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ড কার্যালয়ের সামনে দেশে প্রথমবারের মতো মশা নিয়ন্ত্রণে বিটিআই ব্যবহার করে চসিক। পাউডার আকারে এই ওষুধ প্রথমে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানিতে মিশিয়ে ফগার মেশিন দিয়ে নালায় স্প্রে করা হয়। চসিক কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে বিদেশি এই ওষুধের ব্যবহার নিয়মিতভাবেই চলছে।
চসিকের পরিচ্ছন্ন বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, নগরীতে মশক নিধনে দীর্ঘদিন ধরে লার্ভিসাইড ওষুধ ‘টেমিপোস ফিফটি’ ব্যবহার করা হতো। এর রেজিস্ট্যান্স এখনও ক্রিয়েট হয়নি। চসিক মেয়রের একান্ত ইচ্ছায় এবার বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও কার্যকর পরীক্ষিত ইউএসএতে তৈরি ওষুধ ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। বিদেশি নতুন ধরনের এই ওষুধ একবার ছিটালে ১৫ দিন ওই জায়গা নিরাপদ। তবে পুরো নগরীতে ব্যবহারের সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রজনন হয় এমন জায়গায় আপাতত ছিটানো হচ্ছে। আর নতুন এই ওষুধ ৯৮-৯৯ শতাংশ কার্যকর।
এই ওষুধ ব্যবহারে কিছুটা সমস্যাও আছে। ভালো ওষুধ ব্যবহার করলেও কিছু দিনের মধ্যে রেজিস্ট্যান্স হয়। সে ক্ষেত্রে ওষুধ চেঞ্জ করতে হয়। বেশি দিন একই ওষুধ ব্যবহার করলে মশা রেজিস্ট্যান্স (কার্যকারিতা কমে) হয়।
চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা সরফুল ইসলাম (মাহি) সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিদিন ১০০ ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। ২০০ পরিচ্ছন্নকর্মী যুক্ত আছেন মশক নিধনকাজে। নতুন বিদেশি প্রজাতির ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। এটি শতভাগ কার্যকর বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।
৬০ বর্গমাইলের নগরীর অন্তত ৫০ লাখের বেশি নগরবাসীর জন্য ফগার মেশিন এবং পরিচ্ছন্নকর্মীর সংখ্যা পর্যাপ্ত কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে নগরীতে জনসংখ্যা বাড়ছে। সেই হিসেবে ফগার মেশিন পরিচ্ছন্নকর্মীর সংখ্যা আরও বেশি হওয়া দরকার। সেই তুলনায় স্বল্প আছে বলা যায়। চসিকের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। লোকবল বাড়িয়ে পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম জোরদার করার প্রস্তাব দেওয়া আছে।
ওষুধের কোনো ধরনের ঘাটতি আছে কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ১০ দিন আগে কিছু ঘাটতি ছিল। টেন্ডারসংক্রান্ত জটিলতায় ওষুধ সরবরাহ বিলম্বিত হয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই সংকট নেই।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. তৌহিদুল আনোয়ার সময়ের আলোকে বলেন, বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়ার মশার প্রকোপ কিংবা রোগের বিস্তার। বছরের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। আর এই সময় দেখা যায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। কিন্তু গত বছর চট্টগ্রামে বলতে গেলে সারা বছরই বৃষ্টি ছিল। ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়ার প্রকোপও ছিল সারা বছর। মশা নিধনে চসিকের কোনো ধরনের ঘাটতি আছে কিনা এ প্রশ্নে তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতা বিভাগ ৪১ ওয়ার্ডে যেখানে অভিযোগ বেশি অর্থাৎ মশার প্রকোপ বেশি সেখানে ওষুধ ছিটানো জরুরি। এভাবে নগরীর এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ওষুধ ছিটানোর মতো পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে শঙ্কার কোনো কারণ থাকবে না। পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর আমাদের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রস্তুতিও আছে। গত বছর আমরা চাহিদা অনুযায়ী কিট সরবরাহ করেছি উপজেলার সব হাসপাতালে। এবারও সেই ধরনের প্রস্তুতি আছে। ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ এবার কেমন থাকতে পারে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনও বৃষ্টিপাত শুরু হয়নি। বৃষ্টিপাত শুরু হলে দেখা যাবে পরবর্তী পরিস্থিতি। তবে মশক নিধনে তৎপরতা জোরদার করা খুবই জরুরি বলে মনে করছি। এতে অন্তত আগেভাগে প্রতিরোধমূলক কাজটা হয়ে যায়।
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর প্রায় সব জায়গায় মশার উপদ্রব বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে। বেশিরভাগ লোকজনের অভিযোগ দিনে মশার যন্ত্রণা শুরু হয়। সন্ধ্যার পর আরও বাড়ে। সেহেরি, ইফতার নির্বিঘ্নভাবে করতে এখনই নিয়মিত কয়েল জ্বালাতে হচ্ছে।
নগরীর হামজারবাগ এলাকার বাসিন্দা নূর উর রহমান বলেন, আবাসিক ভবনের ৫ম তলায় বাসা। সন্ধ্যা নামলেই সেখানে মশা বেড়ে যায়। ভবনের নিচতলার বাসিন্দাদের কষ্ট আরও বেশি। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মশার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। চসিক ক্র্যাশ প্রোগ্রামের কথা বললেও মশক নিধনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। এত ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটানোর কথা বলা হচ্ছে। আমার এলাকায় গত ছয় মাসে একবারও ফগার মেশিন হাতে কোনো কর্মীকে দেখিনি।
নগরীর চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা ইদরিস সওদাগর বলেন, আশপাশের নালা নর্দমাগুলো ভরাট হয়ে আছে। এখনও বৃষ্টির মৌসুম শুরু হয়নি। দ্রুত এসব পরিষ্কার না করলে এবার গত বছরের চেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ হতে পারে। এমনিতে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। কিন্তু চসিক কর্মীদের দেখা মিলছে না। জানি না এবার বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে পরিস্থিতি কী হতে পারে।
এএডি/