পাখির গানে বাংলা সুর

মো. আশতাব হোসেন

সাহিত্য

কনকনে পৌষ ও মাঘ মাসের শীতের পাতা আসন ভেঙে দিয়েছে ফাল্গুনের দখিনা বাতাস। শীত ভয়ে পালিয়ে গেছে। পাখিরা মত্ত হয়ে

2026-02-28T01:29:47+00:00
2026-02-28T01:29:47+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
পাখির গানে বাংলা সুর
মো. আশতাব হোসেন
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:২৯ এএম 
ফাইল ছবি
কনকনে পৌষ ও মাঘ মাসের শীতের পাতা আসন ভেঙে দিয়েছে ফাল্গুনের দখিনা বাতাস। শীত ভয়ে পালিয়ে গেছে। পাখিরা মত্ত হয়ে উঠেছে রঙের খেলায়। কোকিল-কোকিলা, দোয়েল, ময়না বাংলার সব পাখি  নেচে নেচে ঘোষণা করছে, বাংলার আনাচে-কানাচে রাজ এসেছে রাজ এসেছে। সোনার বাংলার অঙ্গজুড়ে প্রকৃতি যেন কোমল বসনে জড়িয়ে নিয়েছে তারই বুকে। 

বসন্তের ফুলের সৌরভ আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সবুজ পাতার শাড়ি পরে গাছে গাছে ফুলকলিরা উঁকি দিচ্ছে। কিছু গাছে কলি থেকে ফুল বেরিয়ে হেসে হেসে শোভা বিলাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে আশপাশের এলাকাজুড়ে। আমের বাগিচায় মৌমাছির প্রেমের গান গেয়ে গেয়ে ফুলের মধু সংগ্রহ করে চলছে প্রতিযোগিতা করে এই বাংলার বসন্তপাড়ায়।

সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে আশপাশের এলাকাতে গুঞ্জন,  কী করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি আদায় করে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা যায়। বাংলার দামাল ছেলেরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগঠিত হতে থাকে দাবি আদায় করতে হবে সংগ্রামের মাধ্যমে। জোয়ান-বুড়ো, শিশু-কিশোর সবারই একই অঙ্গীকার রাষ্ট্রভাষা বাংলা হতে হবে। সবাই মিলে শপথ করে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে হলেও আমাদের প্রিয় বাংলাভাষা, মায়ের মুখে শেখা ভাষা অফিস-আদালতসহ সর্বত্রই স্থান করে দিতে হবে। আমাদের অঙ্গীকার ব্যর্থ হতে দেব না। 
আরও পড়ুন

ছাত্র-জনতা সম্মিলিতভাবে বের হয়ে যায়, যার যার মতো করে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে মিছিলে, প্রকম্পিত হতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়সহ চারদিক। পাখিরাও যেন গাছে গাছে বসে একই সুরে বলে যাচ্ছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। সকাল-সন্ধ্যা বরণ করতে চাই বাংলা গানের সুরে সুরে। 

চলছে মিছিল, ছড়াচ্ছে খবর বাংলার আকাশে-বাতাসে। সখিনা জরিনা হালিমার কোলের নব্য বুলি ফোটা শিশুসন্তানরা তাদের মায়ের বুকের দুধ পান বন্ধ রেখে বলে মা, মাগো, ওমা আমরা নাকি তোমার মুখে শেখা কথা বলতে পারব না আর কখনো? ওরা কেন আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চায় মা? সখিনা, হালিমা, জরিনারা মন খারাপ করে চুপ করে থাকে আর চিন্তা করে কী দিয়ে উত্তর দেব এই অবুঝ শিশুদের। নীরবতা ত্যাগ করে মা তার শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, বড় হও সোনামণি। বড় হয়ে ভাষা রক্ষার দাবিতে তোমরাও সংগ্রাম করবে। সংগ্রাম করে বাংলাভাষা রক্ষা করে সবাই একসঙ্গেই বাংলাতে কথা বলবে, গান গাইবে সোনা। ছোট শিশু বলে, না মা তা হতে পারে না! আমিও যাব সংগ্রাম করে তোমার মুখের ভাষা রক্ষা করব মা!

সন্তানের এমন দাবির কথা শুনে মা সান্ত্বনা দিয়ে বলে বড় হও বাবা। বড় হলেই যেতে দেব ভাষা আন্দোলনে। সন্তান বলে আচ্ছা মা, তা হলে বড় হতে থাকি। বড় হয়েই ঝাঁপিয়ে পড়ব ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য। কেড়ে নিতে দেব না তোমার মুখের ভাষা মা; এই তোমার বুকের দুধের কসম করে বলছি! ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর সোয়া ৩টায় সংগ্রামী ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি ছুড়লে প্রথমে শহিদ হন রফিক উদ্দিন আহমেদ!

শোকের ছায়ার সঙ্গে নেমে আসে জনতার ঢল। রফিক উদ্দিনকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করেন সঙ্গীরা ধরাধরি করে। ডাক্তার মৃত্যু নিশ্চিত করলে, আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। ওই একই দিন সকালের দিকে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়ে শফিউর রহমান ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসারত অবস্থায় সন্ধ্যার আঁধার অধিক গাঢ় করে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি বুকে চেপে নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৪৪ ধারা জারি অবস্থায় ছাত্র-জনতা মিছিল চলছেই। আব্দুস সালামের ভেতরের রক্ত টগবগিয়ে যেন দাবি করছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! পুলিশ থেমে নেই গুলি চালিয়ে যাচ্ছে ভাষা আন্দোলন রুখে দেওয়ার জন্য। এমতাবস্থায় পুলিশের ছোড়া গুলি এসে আব্দুস সালামকে  মারাত্মকভাবে  আহত করে। আহত দামাল ছেলে আব্দুস সালামকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করলে চিকিৎসারত অবস্থায় এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে শোকের ছায়া এবং দাবি আদায় ও বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার বুকে চেপে ধরে  চলে যান না ফেরার দেশে শহিদ স্মৃতি ইতিহাসের পাতার ভাঁজে ভাঁজে রেখে দিয়ে। সংগ্রাম চলছে বাংলার বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিক।

পুলিশের গুলিও থেমে নেই, পাকিস্তানি হানাদার পুলিশ বাহিনীর গুলিতে মারাত্মক আহত হয়ে আবদুল জব্বার ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখের  রাতেই অমরত্বের চিহ্ন রেখে তিনিও চলে যান না ফেরার দেশে! বাংলার দোয়েল, কোয়েল, ময়না-শ্যামা সব পাখি গাছে গাছে গাইতে থাকে বাংলার সুমধুর গান। সে গান থেমে নেই, আজও সবুজ শ্যামল বাংলার প্রান্তজুড়ে পাখিদের কণ্ঠে বেজে ওঠে সকাল-সন্ধ্যা বেলায়। বাংলার আকাশে-বাতাসে  ভাষাশহিদদের রক্ত মেখে উদয় হওয়া শুরু করে শিশুসূর্য বাংলার পুব গগনে।

দিন শেষে গোধূলি নিয়ে আসে রক্তিম আভা, সোনার বাংলার পশ্চিম আকাশে ভাষাশহিদের স্মৃতি উজ্জ্বল করে নিদ্রা রস পান করতে যায় বাংলার সূর্য। বাতাস বহন করে চলছে ফেব্রুয়ারির  শহিদ ভাইদের তাজা রক্তের গন্ধ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বাংলায় ফোটা বসন্তের পুষ্প শহিদের পবিত্র রক্ত মেখে উজ্জ্বল থেকে অধিক উজ্জ্বল হয়ে সারা বাংলায় সৌরভ বিলাচ্ছে এবং বিলাবে যুগে যুগে। পাখির কণ্ঠে বাজে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ, ভুলব না, শহিদ ভাইদের বীরত্বগাথা স্মৃতির কথা। আমরাও মৌসুমে মৌসুমে বয়ে নিয়ে চলব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে ভাষাশহিদের রক্তমাখা উজ্জ্বল বাংলা বর্ণমালা রক্ষার কথা।

এএডি/


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: