দীর্ঘ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পুরো মধ্যপ্রাচ্য

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে নিহত ও আহতের তালিকা। ইসরায়েলেরধারাবাহিক বিমান হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এবং ইরানের পাল্টা

2026-03-02T01:46:43+00:00
2026-03-02T01:46:43+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন
দীর্ঘ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পুরো মধ্যপ্রাচ্য
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ১:৪৬ এএম   (ভিজিট : ১৪৭)
প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে নিহত ও আহতের তালিকা। ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা এবং ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণে অঞ্চলটি এখন পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ইরানে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে; রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে বহু মানুষের। অন্যদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলেরও প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হয়েছে, আর অভিযানে নিহত হয়েছেন মার্কিন সেনাসদস্যও। সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছাড়িয়ে বেসামরিক এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। হতাহতের এই ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান শুধু দুই পক্ষের শক্তি পরীক্ষার চিত্র নয়, বরং পুরো অঞ্চলকে একটি বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কাকেই আরও ঘনীভূত করছে।

হামলা-পাল্টাহামলার ধারাবাহিক চিত্র : আলজাজিরার লাইভ ব্লগে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের হামলার পর তেহরানের একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ শোনা যায় এবং সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা বিপজ্জনক মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে। আলজাজিরা জানায়, ইসরাইল প্রথমে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আকাশ হামলা চালায়। তেহরান, ইসফাহান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিস্ফোরণের খবর আসে। ইরান দাবি করে, এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছে এবং ইরানের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এর পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

হতাহতের ভয়াবহ চিত্র : বিবিসি জানিয়েছে, ইসরায়েলের অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড নিশ্চিত করেছে, ইরানবিরোধী অভিযানে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। আরও কয়েকজন শেল-আঘাত ও বিস্ফোরণজনিত আঘাতে আহত হয়েছেন। দুবাইয়েও এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবর এসেছে, যা সংঘাতের বিস্তৃতি বোঝায়।

বিবিসি জানিয়েছে, ইরানে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি স্কুলে হামলায় ১৪৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শিশুদের মৃত্যুর এই ঘটনা যুদ্ধের মানবিক মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে তার নির্মম প্রমাণ। তেহরানজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড়। সামাজিক মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপ ও আহতদের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে।

ইরানে প্রাণহানির সংখ্যা ইতিমধ্যে ২০০ ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ একাধিক শহরে বিমান হামলা ও লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি সূত্র বলছে, নিহতদের মধ্যে সামরিক কর্মকর্তার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষও রয়েছেন। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়ছে, অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে আবাসিক ভবন, প্রশাসনিক স্থাপনা এবং সামরিক অবকাঠামোর কিছু অংশ।
বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন, শোকাতুর ইরান : তেহরানের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা উদ্ধারকাজ ও তথ্যপ্রবাহে জটিলতা তৈরি করছে। মানবাধিকারকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলার ফলে নারী ও শিশুদের হতাহতের ঘটনাও সামনে আসছে।

একই সঙ্গে দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিহতদের স্মরণে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে, বহু শহরে শোকমিছিল বের হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২শর বেশি প্রাণহানি শুধু সামরিক সংঘাতের পরিসংখ্যান নয় এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সর্বোচ্চ নেতৃত্বের মৃত্যু ও অন্তর্বর্তী সরকার : যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ঘোষণা করেছে। ইরনা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন আলেমের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ দায়িত্ব পালন করছে। কাজাখস্তানভিত্তিক কুরসিভ মিডিয়া জানিয়েছে, তেহরান ‘জিহাদের ডাক’ দিয়েছে এবং জনগণকে প্রতিরোধে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্য : ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ‘অস্তিত্বের বিরুদ্ধে আগ্রাসন’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। আইআরজিসি ঘোষণা দিয়েছে, ‘প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে’ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করেছে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে বলা হয়েছে, ‘ইরান আত্মসমর্পণ করবে না, প্রতিশোধ অবধারিত।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বলেন, ‘তেহরানের জন্য ভালো প্রার্থী আছে।’ সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সম্ভাব্য নেতৃত্বের বিষয়ে তিনি জানেন, তবে প্রকাশ করবেন না। ইসরায়েলের নেতৃত্ব বলেছে, ‘ইরানের সামরিক হুমকি নির্মূল করাই লক্ষ্য।’ তারা এটিকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে।

মাহমুদ আহমেদিনেজাদের মৃত্যু : ইসরাইলি একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলায় নিহত হয়েছেন। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা আহমেদিনেজাদ পশ্চিমবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন।

হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি সংকট : হরমুজ প্রণালিতে ‘স্কাইলাইট’ নামের তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ওমান জানিয়েছে, চারজন আহত হয়েছেন এবং ক্রুদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাতার এই হামলাকে ওমানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল সরবরাহ হয়। ফলে বৈশ্বিক তেলের দাম অস্থির হয়ে উঠেছে।

বিরোধী নেতৃত্বের সক্রিয়তা : মরিয়ম রাজাভি প্যারিস থেকে ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ’ বলে উল্লেখ করেছেন। রেজা পাহলভি এক্সে লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত বিজয় জনগণের।’ তিনি হামলাকে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন।
উত্তরসূরি সংকট : রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের মধ্যে মুজতবা খামেনি ও হাসান খোমেনির নাম আলোচনায়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য, তবে চলমান হামলা প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।

আইআরজিসির ভূমিকা : আইআরজিসি ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৯ সালে তাদের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করলেও আঞ্চলিক প্রভাব অটুট রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতা সাময়িকভাবে তাদের হাতেও যেতে পারে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব : এই সংঘাত এখন আর সীমিত নয়। লেবানন, সিরিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল সবখানেই নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়েছে। তেলের বাজার অস্থির। আন্তর্জাতিক কূটনীতি তৎপর হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।


  বিষয়:   মধ্যপ্রাচ্য  যুদ্ধ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: