মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেক দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়েছে অথবা দীর্ঘ সময় বিলম্বিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রানজিট এয়ারপোর্টে আটকে পড়া বা হঠাৎ ফ্লাইট বাতিলের কবলে পড়া বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য তাদের আইনি অধিকার এবং করণীয় সম্পর্কে জেনে নেয়া জরুরি।
এয়ারলাইনের বাধ্যবাধকতা ও যাত্রীদের অধিকার
সাধারণত যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশ থেকে ফ্লাইট ধরলে অথবা সেসব দেশের এয়ারলাইন ব্যবহার করলে যাত্রীদের কিছু নির্দিষ্ট অধিকার আইনিভাবে নিশ্চিত থাকে। ফ্লাইট দীর্ঘ সময় বিলম্বিত হলে বা বাতিল হলে এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের খাবার ও পানীয় (ভাউচার আকারে), যোগাযোগের জন্য ফোনকল বা ইন্টারনেটের ব্যবস্থা এবং রাত কাটানোর প্রয়োজন হলে হোটেল ও যাতায়াত সুবিধা দিতে বাধ্য। যদি এয়ারলাইন এসব সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে যাত্রী নিজে ব্যবস্থা করে সব রসিদ বা ভাউচার সংরক্ষণ করবেন, যাতে পরবর্তীতে ওই টাকা দাবি করা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ফ্লাইট বাতিল হলে বিকল্প ব্যবস্থা
ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেলে যাত্রী হিসেবে আপনার কাছে দুটি প্রধান বিকল্প থাকে। প্রথমত, আপনি চাইলে ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করে টিকিটের পুরো টাকা ফেরত নিতে পারেন। এমনকি রিটার্ন টিকিটের ক্ষেত্রে যাওয়ার ফ্লাইট বাতিল হলে পুরো রিটার্ন টিকিটের টাকাই ফেরত পাওয়ার অধিকার রয়েছে। দ্বিতীয়ত, আপনি যদি গন্তব্যে যেতেই চান, তবে এয়ারলাইনকে কোনো অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই দ্রুততম সময়ে বিকল্প ফ্লাইট বা উপযুক্ত অন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বর্তমান সংকটে আসনস্বল্পতা থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ফাঁকা আসন পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে।
সময়সীমা ও বিশেষ সহায়তা
ফ্লাইট কতক্ষণ বিলম্বিত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে সহায়তার ধরণ ভিন্ন হয়। স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইটে ২ ঘণ্টা, মাঝারি দূরত্বে ৩ ঘণ্টা এবং দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটে ৪ ঘণ্টার বেশি দেরি হলে এয়ারলাইনকে খাবার, পানীয় ও প্রয়োজনে হোটেলের সুবিধা দিতে হবে। যদি বিলম্বের সময় ৫ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়, তবে যাত্রী চাইলে ভ্রমণ বাতিল করে পুরো টাকা ফেরতের দাবি জানাতে পারেন। যারা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে প্যাকেজ ট্যুর বুক করেছেন, তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মটি প্রায় একই; তারা হয় বিকল্প ফ্লাইট পাবেন অথবা সম্পূর্ণ টাকা ফেরত পাবেন।
অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ ও সীমাবদ্ধতা
যুদ্ধ, সামরিক সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ধর্মঘটের মতো বিষয়গুলোকে ‘এক্সট্রা-অর্ডিনারি সারকামস্ট্যান্সেস’ বা অসাধারণ পরিস্থিতি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ফ্লাইট বাতিল বা দেরি হলে সাধারণত এয়ারলাইন থেকে অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ (কম্পেনসেশন) পাওয়া যায় না। তবে যদি বিলম্ব বা বাতিলের পেছনে সরাসরি এয়ারলাইনের গাফিলতি থাকে, তবেই কেবল দূরত্ব অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দাবি করা সম্ভব।
কর্মস্থল ও আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলা
ফ্লাইট দেরির কারণে যদি আপনি নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারেন এবং এর ফলে আপনার বেতন বা আর্থিক ক্ষতি হয়, তবে এয়ারলাইন সেই দায় নেবে না। ট্রাভেল ইনস্যুরেন্সও সাধারণত এ ধরনের ক্ষতি কভার করে না। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো বিলম্বের বিষয়টি দ্রুত আপনার অফিসকে জানান এবং ছুটি বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর বিষয়ে নিয়োগকর্তার সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলে এমন পরিস্থিতিতে নিয়োগকর্তার বেতন দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
ইনস্যুরেন্স ও সতর্কতা
ভ্রমণের আগে নিজের টিকিটের শর্ত এবং ট্রাভেল ইনস্যুরেন্সের পলিসিটি অত্যন্ত খুঁটিয়ে পড়া জরুরি। সব পলিসি সব ধরনের পরিস্থিতিতে ক্ষতিপূরণ দেয় না। তাই পলিসিটি কী কভার করে, কোন পরিস্থিতিতে করে এবং সর্বোচ্চ কত টাকা দেয় তা আগেভাগেই জেনে রাখা উচিত। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ধৈর্য বজায় রাখা এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকাই বিপদের সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
সময়ের আলো/আরবিএন