নওগাঁয় সরকারি খাল খননের মাটি টেন্ডার ছাড়াই রাতের আঁধারে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে বনফুল ব্রিকস নামের একটি ইটভাটা। খবর পেয়ে প্রশাসন সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করে দিলেও সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারও রাতে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। এতে এলাকার চলাচলের একমাত্র রাস্তাসহ খালপাড়ের গ্রামগুলো পড়েছে হুমকির মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটা মালিক ও খনন কাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জোগসাজশে এসব মাটি ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবৈধ এই কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিকেএসএফের সহযোগিতায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) ব্যাস্তবায়নে এক্সটেন্ডেড কমিউনিটি ক্লাইমেট চেঞ্জ প্রজেক্টের (ইসিসিসিপি-ড্রট) আওতায় নওগাঁ সদর উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নে তিন কিলোমিটার খাল খনন কার্যক্রম শুরু করা হয় গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। পশ্চিম শিকারপুরের জব্বার মেম্বারের বাড়ি থেকে মোবারক মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত খয়রাদারা খাল খননের জন্য মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৯৯ লাখ টাকা। এই হিসাবে প্রতি কিলোমিটার খাল খননের বরাদ্দ ৩৩ লাখ টাকা।
খাল খনন করছে টেকবে ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু খালটির খননকৃত মাটি কোনোরকম টেন্ডার ছাড়াই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পাশের বনফুল ব্রিকস নামের একটি ইটভাটায়।
ইতিমধ্যে খালটির এক কিলোমিটার খনন কাজ শেষ হয়েছে। আর এই খাল খননের লাখ লাখ টাকার মাটি কোনো টেন্ডার ছাড়াই রাতের আঁধারে বনফুল ব্রিকস ইটভাটায় নেওয়া হয়েছে। মাটির লোভে খালের পাড়ে ন্যূনতম জায়গা না রেখেই মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। এতে এলাকার চলাচলের একমাত্র রাস্তাসহ খালপাড়ের গ্রামগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং এসি ল্যান্ড যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে কাজটি সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া ইটভাটায় মাটি নেওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশাসনের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘটনার রাতেই ৪০ থেকে ৫০টি ট্রাক্টর লাগিয়ে আবারও রাতভর মাটি কেটে ইটভাটায় নেওয়া হয়। এভাবে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইবনুল আবেদীন বলেন, সরেজমিন পরিদর্শন করার পর খাল খননের মাটি নিয়ে যাওয়াসহ কাজটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বলেন, খাল খননের কাজ শেষে কত সিএফটি মাটি বের হলো সেই হিসাব করার পর নিলাম আহ্বান করা হবে। তার আগে যদি কেউ মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তা হলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন ইউএনও।
জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেকবে ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের প্রতিনিধি ইসরাইল হোসেন বলেন, আমরা খাল খননের কোনো মাটি ইটভাটায় নিচ্ছি না। খাল সংলগ্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির মাটি খনন করে নিয়ে যাচ্ছি। পরে খননকৃত গর্তে খালের কাদামাটি দিয়ে ভরাট করে দিচ্ছি।
এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে বনফুল ব্রিকস ইটভাটার মালিক একরামুল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সরেজমিন আলাপকালে পশ্চিম শিকারপুর গ্রামের নজরুল হোসেন বলেন, খালের দিকে রাস্তার সীমানা রয়েছে প্রায় ১৫ ফুট। খাল খননের মাটি দিয়ে রাস্তা না বেঁধে সব মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমার বাড়ির সামনে এক দিন আগে খনন করা হয়েছে। আর এক দিন পরই ধসে যেতে শুরু করেছে। এভাবে রাস্তার পাশে না বেঁধে খাল খনন করা হলে সামনে বন্যায় রাস্তাটি ধসে যাবে। এতে খালপাড়ের গ্রামগুলোও প্লাবিত হবে। এইভাবে খাল খনন হলে তা আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হবে।
একই গ্রামের রাজুসহ একাধিক বাসিন্দা বলেন, খাল খনন করে যে মাটি বের হচ্ছে সেগুলো রাতের বেলা ৪০-৫০টি ট্রাক্টরে ভরে পাশের ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এতে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনে হচ্ছে এটা যেন মগের মুল্লুক! অন্যায়কারীরা এতটাই প্রভাবশালী যে ইউএনও এবং এসি ল্যান্ড নিজে এসে কাজ বন্ধ করে দিলেও আদেশ মানছে না তারা। দিনের বেলা কাজ বন্ধ রাখলেও রাতে তারা ঠিকই মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে।
সময়ের আলো/আরবিএন