ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের হলেও নতুন মাত্রা পেয়েছে ২০২৬ সালের মার্চে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালায়। এই হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পুরনো শত্রুতা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। পাল্টা হামলার মাধ্যমে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। তার এই মন্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এবং কতখানি খরচ বহন করতে পারবে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু
২৮ ফেব্রুয়ারি, ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ৮ মিনিটের একটি ভিডিও পোস্ট করে ঘোষণা দেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূখণ্ডে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। পরে পেন্টাগন এই অভিযানকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নাম দেন। ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রশিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
প্রথম ধাপেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ১ হাজার ২৫০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এসময় ইরানের ১১টি জাহাজও ধ্বংস করা হয়। হামলা চলেছে বিমান, সাগর ও স্থল থেকে, এবং লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্য করা হয়েছে। এছাড়া ইরানের প্রতিরক্ষা সংস্থা ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপরও আঘাত চালানো হচ্ছে।
ব্যবহৃত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-তে ব্যবহার করা হয়েছে আকাশ, সাগর, ভূমি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলিয়ে ২০টির বেশি আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
যুদ্ধবিমান
বি-১ এবং বি-২ স্টিলথ, যা বিশেষভাবে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে এফ-৩৫ এবং এফ-১৫, যেগুলো কুয়েতে কয়েকটি বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া রয়েছে এফ-১৬ ফ্যালকন এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাশাপাশি রয়েছে লুকাস ড্রোন, যা একবারের আঘাতে ব্যবহারযোগ্য।
এর সঙ্গে রয়েছে, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, মূলত নজরদারির কাজে ব্যবহৃত; এম ১৪২ হাই মবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম (হিমার্স), যা ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য; টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, যা সাগর থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও কাউন্টার সিস্টেম
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। থাড (THAAD) সিস্টেম, যা শত্রু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংসে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া বিশেষভাবে ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার জন্য কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
নৌশক্তি ও রণতরী
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন; এর পাশাপাশি পি-৮ পসেইডন টহল উড়োজাহাজ, যা সমুদ্রপথে নজরদারি ও টহল দিচ্ছে। একইসঙ্গে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার, সি-১৮০ হারকিউলিসসহ বিভিন্ন মডেলের উড়োজাহাজ, যা সরবরাহ ও রসদ পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রাথমিক খরচ ও বাজেট
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবেল জানিয়েছেন, ইউএসএস জেরাল্ড বা ফোর্ডের মতো বিমানবাহী রণতরি পরিচালনায় প্রতিদিন আনুমানিক ৬৫ লাখ ডলার খরচ হয়। এছাড়া সরঞ্জামের ক্ষতি ও অন্যান্য অপারেশনাল খরচ যুক্ত হয়।
তুরস্কের আনাদোালু সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন এপিক ফিউরির’ প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার খরচ করেছে। অপারেশনের আগে যুদ্ধবিমানের অবস্থান পরিবর্তন, নৌযান মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সম্পদ একত্র করার জন্য আরও প্রায় ৬৩ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়েতে ভুলক্রমে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। যদিও আর্থিক ক্ষতি তুলনামূলকভাবে বড় উদ্বেগের বিষয় নয়, তবে অস্ত্র ও সরঞ্জামের মজুত যথেষ্ট রয়েছে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সামগ্রিক খরচ ও বাজেটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট এক ট্রিলিয়ন ডলার, তবে তা দেড় ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্ট অব ওয়ার’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিতে মার্কিন করদাতাদের পকেট থেকে ৯৬৫ কোটি থেকে ১,২০৭ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ৩,১৩৫ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৩,৩৭৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যুদ্ধের লক্ষ্য
সেন্ট্রাল কমান্ডের সাবেক পরিচালক কেভিন দোনেগান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনা। যাতে ইরান আর ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে না পারে। এই অভিযানকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত প্রতিরোধের পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্য হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
/ইউএমএইচ