রোজাদার অ্যাথলেটদের মাঠে ব্যতিক্রমী ইফতার

রিফাত আনজুম

খেলা

২০২৬ সালের পবিত্র রমজান মাস বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন সভ্যতার বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে কনকনে শীতের মাঝে ইউরোপীয় ফুটবলের উত্তাপ,

2026-03-04T06:18:41+00:00
2026-03-04T06:18:41+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
খেলা
রোজাদার অ্যাথলেটদের মাঠে ব্যতিক্রমী ইফতার
রিফাত আনজুম
প্রকাশ: বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ৬:১৮ এএম 
সংগৃহীত ছবি
২০২৬ সালের পবিত্র রমজান মাস বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন সভ্যতার বার্তা নিয়ে এসেছে। একদিকে কনকনে শীতের মাঝে ইউরোপীয় ফুটবলের উত্তাপ, অন্যদিকে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ২২ গজের লড়াই। 

এই দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির মাঝেও মুসলিম অ্যাথলেটরা তাদের ধর্মীয় নিষ্ঠা ও রোজা রাখা অবস্থায় পেশাদারিত্বের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। মাঠের গতির মাঝখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য খেলা থামিয়ে ইফতার করার দৃশ্যগুলো কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয় বরং তা হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক সম্প্রীতি ও মানবিকতার এক জীবন্ত দলিল।

২০২৬ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো, বিশেষ করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ এবং জার্মান বুন্দেসলিগায় মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ন্যাচারাল পজ’ বা ইফতার বিরতি কার্যকর রেখেছে। তবে এবারের রমজান কেবল নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং কিছু স্পর্শকাতর ও আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে। 

গত ১ মার্চ লিডস ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ম্যাচে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ম্যাচের ১৩তম মিনিটে সূর্যাস্ত হলে রেফারি খেলা সাময়িক বন্ধ করেন। ম্যানচেস্টার সিটির তারকা রিয়ান চেরকি, ওমর মারমুশ এবং রায়ান আইত-নুরি যখন সাইডলাইনে গিয়ে দ্রুত খেজুর আর পানি মুখে তুলছিলেন, তখন গ্যালারির একটি অংশ থেকে অনাকাক্সিক্ষত দুয়োধ্বনি শোনা যায়।

কিন্তু মাঠের ভেতরে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিটির অমুসলিম সতীর্থ এবং কোচ পেপ গার্দিওলা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি একটি আধুনিক বিশ্ব এবং আমাদের একে অন্যের বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে। এই সংকটময় মুহূর্তে অমুসলিম খেলোয়াড়রাই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের মুসলিম সতীর্থদের জন্য। 

অনেক ম্যাচে দেখা গেছে, সূর্যাস্তের সময় ঘনিয়ে এলে অমুসলিম খেলোয়াড়রা ইচ্ছাকৃতভাবে বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন, যাতে রেফারি ইফতারের বিরতি দিতে বাধ্য হন। হাঙ্গেরিয়ান লিগেও প্রথমবারের মতো এমন বিরতির প্রচলন শুরু হয়েছে, যেখানে দর্শকরা দাঁড়িয়ে রোজাদার খেলোয়াড়দের সম্মান জানাচ্ছেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ফ্রান্সের লিগ ওয়ানের একটি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ন্যান্টেস এবং লে হাভরে। ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশনের কঠোর নিয়মের কারণে সেখানে খেলা চলাকালে ইফতারের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বিরতি দেওয়ার সুযোগ নেই কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় তখন সূর্যাস্ত, ন্যান্টেসের বেশ কয়েকজন মুসলিম খেলোয়াড়ের ইফতারের সময় হয়ে এসেছে। ম্যাচের ৭৪ মিনিটে এক অভাবনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে ফুটবল বিশ্ব। ন্যান্টেসের অভিজ্ঞ পর্তুগিজ গোলরক্ষক অ্যান্থনি লোপেস হঠাৎ করেই কোনো সংঘাত ছাড়াই মাঠের ওপর লুটিয়ে পড়েন। তিনি তার বাঁ-পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ে তীব্র ব্যথার অভিনয় করতে থাকেন। 

নিয়ম অনুযায়ী, গোলরক্ষক আহত হলে খেলা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। রেফারি বাধ্য হয়ে খেলা থামিয়ে দেন এবং মেডিকেল টিম মাঠে প্রবেশ করে। ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগান দলের পাঁচজন মুসলিম সতীর্থ। তারা দ্রুত সাইডলাইনে গিয়ে খেজুর এবং পানি দিয়ে তাদের রোজা সম্পন্ন করেন। 


ইফতার শেষ হওয়ামাত্রই অ্যান্থনি লোপেস সুস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ান এবং পুনরায় খেলা শুরু করেন। ম্যাচ শেষে তার এই ‘মানবিক অভিনয়’ ফাঁস হয়ে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসার জোয়ার বয়ে যায়। ফুটবলের এই সম্প্র্রীতির ঢেউ আছড়ে পড়ে ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মাটিতে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের মাঝপথেই শুরু হয়েছে রমজান। 

আইসিসি এবং স্বাগতিক দেশগুলো এবার রোজাদার ক্রিকেটারদের জন্য বিশেষ ‘রামাদান গাইডলাইন’ অনুসরণ করছে। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আসর এবার কেবল ছক্কা আর উইকেটের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; ভারত ও শ্রীলঙ্কার তপ্ত রোদে এই টুর্নামেন্ট হয়ে উঠেছে মানবিকতা ও আন্তঃধর্মীয় সখ্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

বিশেষ করে টুর্নামেন্টের মাঝপথে পবিত্র রমজান শুরু হওয়ায় মুসলিম ক্রিকেটারদের প্রতি অমুসলিম সতীর্থ ও প্রতিপক্ষদের যে সহমর্মিতা দেখা যাচ্ছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল। ইংল্যান্ডের আদিল রশিদ ও রেহান আহমেদ থেকে শুরু করে জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা মাঠের ইফতারের এই দৃশ্যগুলো বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলে দীর্ঘকাল ধরেই বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানো হয়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে ভারত-ইংল্যান্ডের একটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে দেখা গেল এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। যখন ইংল্যান্ড ফিল্ডিং করছে, ঠিক তখনই সূর্যাস্তের সময় হয়ে আসে। 

লেগস্পিনার আদিল রশিদ এবং তরুণ তুর্কি রেহান আহমেদ তখনও মাঠে লড়ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আম্পায়ার যখন ড্রিঙ্কস ব্রেক ঘোষণা করেন, তখন ইংল্যান্ডের অমুসলিম সতীর্থরা বিশেষ করে অধিনায়ক জস বাটলার এবং হ্যারি ব্রুক নিজেদের হাতে করে খেজুর এবং এনার্জি ড্রিঙ্কস নিয়ে মাঠের মাঝখানে দৌড়ে যান। 

আদিল ও রেহান যখন হাঁটু গেড়ে বসে মাঠের ঘাসেই ইফতার সারছিলেন, তখন সতীর্থরা তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে এক সুরক্ষাবলয় তৈরি করেন যাতে তারা শান্তিতে ইফতার করতে পারেন। এক্সে একজন ভক্ত লেখেন, এটিই ক্রিকেটের আসল স্পিরিট, যেখানে ধর্ম বিশ্বাসকে পেশাদারিত্বের চেয়েও বেশি সম্মান দেওয়া হয়।

অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ে এবং নিউজিল্যান্ডের ম্যাচে দেখা যায় আরেক অভূতপূর্ব দৃশ্য। জিম্বাবুয়ের সিকান্দার রাজা যখন ব্যাটিং করছিলেন, তখন ইফতারের সময় হয়ে যায়। কিউই ফিল্ডাররা এবং জিম্বাবুয়ের ড্রেসিংরুম থেকে সতীর্থরা তাৎক্ষণিক এগিয়ে আসেন। 

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে জিম্বাবুয়ের অমুসলিম সতীর্থদের ভূমিকা। ড্রেসিংরুম থেকে রাজার জন্য বিশেষ হাইড্রেটিং পানীয় তৈরি করে এনেছিলেন তার সতীর্থরা। ম্যাচ শেষে রাজা তার ফেসবুক পেজে একটি ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, মাঠে আমরা ১১ জন খেলি কিন্তু ইফতারের সময় আমরা সবাই এক হয়ে যাই।’

সময়ের আলো/এআর


  বিষয়:   রোজাদার  অ্যাথলেট  ইফতার 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: