ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক আগ্রাসনকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনেও তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে এই সংঘাতে ইরানে নিহতের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান সীমিত করার প্রস্তাব ৫৩-৪৭ ভোটে নাকচ হয়ে গেছে, ফলে যুদ্ধের লাগাম টানার রাজনৈতিক উদ্যোগও ব্যর্থ হয়েছে।
একই সময়ে সংঘাত নতুন ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, আজারবাইজান অভিযোগ করেছে যে তাদের একটি বিমানবন্দর ও একটি স্কুলের কাছে ড্রোন আঘাত হেনেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলেও উত্তেজনা বাড়ছে। খালিজ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের নিক্ষেপ করা একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ডে ভূপাতিত হয়েছে। সবমিলে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সব শত্রুরা এখন ড্রোন আতঙ্কে ভুগছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা গত মঙ্গলবার এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সম্পদের ওপর ইরানের হামলায় ব্যবহৃত প্রতিটি ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা তাদের নাও থাকতে পারে।
ইরানজুড়ে বিস্ফোরণ, তেহরানে নতুন হামলা : ইরানের বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, রাজধানী তেহরানকে লক্ষ্য করে ইসরাইল নতুন দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী তেহরানে ‘বৃহৎ আকারের হামলার ঢেউ’ চালিয়েছে এবং এতে দূরপাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হামলার ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ধোঁয়া দেখা গেছে এবং অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর স্থাপনা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো। একই সময় লেবাননের কিছু এলাকায়ও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলছে, এসব হামলায় শুধু সামরিক স্থাপনাই নয়, আবাসিক এলাকা ও বেসামরিক অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানীর কিছু এলাকায় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।
এদিকে তেহরানে উদ্ধারকাজও চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে কাজ করছে উদ্ধারকর্মীরা। পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ যে শহরের বহু বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
হামলায় নিহত ১২০০র বেশি : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। টাইম ম্যাগাজিন জানিয়েছে, প্রথম কয়েক দিনের হামলাতেই এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আর আলজাজিরার খবর অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা এক হাজার ২৩০। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, নিহতদের মধ্যে অনেক বেসামরিক নাগরিক রয়েছে। আহতের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছেছে।
একটি আলোচিত ঘটনায় ইরানের মিনাব শহরের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় বহু শিশু নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এই হামলাকে সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইসরাইল বলছে, তাদের হামলা মূলত সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য। এই সংঘাতে শুধু ইরান নয়, ইসরাইল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ মার্কিন সিনেট : যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই যুদ্ধ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। মার্কিন সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান সীমিত করার একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ভোটাভুটিতে তা ৫৩-৪৭ ব্যবধানে নাকচ হয়ে যায়।
প্রস্তাবটির পক্ষে থাকা আইনপ্রণেতারা বলেছিলেন, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনা করা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের মতে, যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্তে আইনসভাকে অবশ্যই যুক্ত থাকতে হবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের অনেক সিনেটর ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য জরুরি। এই ভোটাভুটির ফলাফল ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরাক সীমান্তে অস্থিরতার আশঙ্কা : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করেছেন যে দেশটির ইরাক সীমান্তে ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা’ বাড়তে পারে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র কুর্দি বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তাদের অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা থাকতে পারে। এই পরিস্থিতি ইরানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হুরমুজ প্রণালি সংকটে বিশ্ব জ্বালানি বাজার : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, হুরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন এই প্রণালি দিয়ে হয়। ফলে অনেক জাহাজ এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমিরাতে পড়ল ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন : সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, ইরানের নিক্ষেপ করা একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন তাদের ভূখণ্ডে ভূপাতিত হয়েছে।
খালিজ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোট সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে যার মধ্যে ছয়টি ভূপাতিত করা হয়। এ ছাড়া ১৩১টি ড্রোন শনাক্ত করা হয় যার বেশিরভাগই ধ্বংস করা হয়েছে। এই ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আজারবাইজানে ড্রোন হামলার অভিযোগ : আজারবাইজান অভিযোগ করেছে যে তাদের নাখচিভান অঞ্চলের একটি বিমানবন্দর ও একটি স্কুলের কাছে ড্রোন আঘাত হেনেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন এবং দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ড্রোন ভূপাতিত করার মার্কিন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন : যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরান হাজার হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে’ (একমুখী) অ্যাটাক ড্রোন মোতায়েন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা আছে ঠিকই। তবে এই বিশাল সংখ্যার সব কটি ঠেকানো সম্ভব নয়।
ক্যাপিটল হিলে আইনপ্রণেতাদের দেওয়া এক গোপন ব্রিফিংয়ে কর্মকর্তারা জানান, এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র যত দ্রুত সম্ভব ইরানের ড্রোন এবং প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো (লঞ্চ সাইট) ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় তথ্যদাতা ব্যক্তিরা নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ কথাগুলো বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান তাদের কম খরচের ‘শাহেদ’ ড্রোন উৎক্ষেপণ করছে। এগুলো নিচু দিয়ে এবং ধীরগতিতে ওড়ার কারণে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বেশি ফাঁকি দিতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেবাননে নতুন হামলা : ইসরাইল লেবাননেও হামলা জোরদার করেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে চালানো হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এই পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
এফআর