ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে কেবল নতুন একটি সামরিক ফ্রন্টই খুলে দেয়নি। এটি কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করা বহু পুরোনো মিথ ভেঙে দিয়েছে। গত কয়েক দিনে যা ঘটেছে, তা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘর্ষ নয়। এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ বা মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
অনেক আখ্যান কিংবা ধারণাকে একসময় অটল সত্য বলে মনে করা হতো, বাস্তবতার চাপে সেগুলো ভেঙে পড়েছে। একই সঙ্গে এমন কিছু তত্ত্বও সত্য প্রমাণিত হয়েছে, যেগুলো আগে অনেকেই আদর্শিক বা অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিত।
আমেরিকান সুরক্ষার মিথ : দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন নিজেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার সর্বশেষ গ্যারান্টি হিসেবে তুলে ধরেছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানবাহী রণতরী, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তিগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এগুলো মিত্রদের অস্তিত্বগত হুমকি থেকে রক্ষা করার ঢাল। এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে সেই প্রতিশ্রুতি ফাঁপা।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক মিত্ররা ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, ড্রোন অনুপ্রবেশ এবং সমুদ্রপথে হুমকির মুখে পড়েছে। মার্কিন সেনারাও নিহত হয়েছে। জ্বালানি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়েছে। নৌপরিবহন পথ অস্থির হয়ে উঠেছে।
আমেরিকান বাহিনীর উপস্থিতি সংঘাত ঠেকাতে পারেনি বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সংঘাতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— মার্কিন উপস্থিতির প্রকৃত চরিত্র এখন স্পষ্ট হয়েছে। এটি অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে নয় বরং আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই আধিপত্যও এখন ভ্রান্ত বলে প্রমাণ হচ্ছে। সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব মানেই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নয়। ইরানের মতো কোনো আঞ্চলিক শক্তি যদি পাল্টা আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেয়, তা হলে আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ধারণা দ্রুত ভেঙে যেতে পারে।
‘কন্টেইনমেন্ট’ নীতির ব্যর্থতা : বহু বছর ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ইরানকে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছেন, যাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দুর্বল করা যাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘কন্টেইনমেন্ট’ কৌশলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে কোণঠাসা করা যাবে। ধারণাটি এমন যে, তেহরান কৌশলগতভাবে বন্দি হয়ে থাকবে। এখন সেই ধারণা ভেঙে পড়েছে।
ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, চূড়ান্ত চাপে পড়লে পুরো আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে অস্থির করে দেওয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা দুটোই তার আছে। ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রতা এবং সমুদ্রপথে প্রভাব; এসব ইরানকে এমন শক্তি দিয়েছে, যা তার সীমান্তের অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘কন্টেইনমেন্ট’ নীতি ধরে নেয় লক্ষ্যবস্তু হওয়া রাষ্ট্রটি নিষ্ক্রিয় থাকবে। কিন্তু ইরান মোটেও নিষ্ক্রিয় নয়।
এই বাস্তবতার একটি মৌলিক অর্থ আছে। ইরানের অধিকার, স্বার্থ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ সহজে উপেক্ষা করা যাবে না। একটি টেকসই আঞ্চলিকব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয় যদি সেই ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় একটি রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে প্রান্তিক করে রাখা হয়।
ইসরাইলের ‘আঞ্চলিক সুরক্ষা’ ধারণার ভ্রান্তি : মধ্যপ্রাচ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিগুলোকে একসময় স্থিতিশীলতার নতুন স্থাপত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। ইসরাইলকে তুলে ধরা হয়েছিল এমন এক প্রযুক্তিগত, সামরিক ও গোয়েন্দা শক্তি হিসেবে, যা তার নতুন আরব অংশীদারদের আঞ্চলিক হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারবে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ; গাজায় গণহত্যা থেকে শুরু করে বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধ এই বাস্তবতা ভেঙে দিয়েছে।
ইসরাইল অঞ্চলকে স্থিতিশীল করেনি বরং অস্থিতিশীল করেছে। এর যুদ্ধগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোকে সহিংসতার নতুন চক্রে টেনে এনেছে। এর সংঘর্ষগুলো আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য ইসরাইল নিরাপত্তা ছাতা হতে পারবে; এই ধারণা এখন গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। আঞ্চলিক রক্ষাকবচ হওয়ার বদলে ইসরাইল এখন বৃহত্তর সংঘাতের একটি অনুঘটক হয়ে উঠেছে।
সমন্বয় কৌশলের ভুল হিসাব : সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্রকে বলা হয়েছিল, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে পূর্ণ সমন্বয় তাদের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। কিন্তু এখন বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে; সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। দুবাইয়ে আঞ্চলিক উত্তেজনার আশঙ্কায় বহু প্রবাসী নাকি দ্রুত দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছেন।
নিরাপত্তা বাইরে থেকে আমদানি করা যায় না। বাহ্যিক শক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয় কোনো রাষ্ট্রকে আঞ্চলিক পরিণতি থেকে মুক্ত রাখে না বরং অনেক সময় এমন জোট রাষ্ট্রগুলোকে এমন সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে, যেগুলো তাদের নিজের পছন্দের নয়। সমন্বয় মানেই নিরাপত্তা; এই প্রতিশ্রুতি বিপজ্জনকভাবে সরল ছিল।
ইরাক-পরবর্তী ব্যবস্থার সমাপ্তি : ইরাকে আগ্রাসনের পর থেকে ওয়াশিংটন একটি নির্দিষ্ট কৌশলগত সূত্র মেনে চলছিল। এই সূত্রের তিনটি মূল উপাদান ছিল— স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি, অঞ্চলকে কঠোরভাবে ‘মিত্র’ ও ‘প্রতিপক্ষ’ ভাগে ভাগ করা এবং ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন। এখন সেই মডেল তীব্র চাপে রয়েছে, অন্তত এটুকু বলা যায়। স্থায়ী ঘাঁটিগুলো এখন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। অঞ্চলকে দুই ভাগে বিভক্ত করার নীতি স্থিতিশীলতার বদলে মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। আর ইসরাইলের সামরিক অভিযানে অন্ধ সমর্থন ওয়াশিংটনকে বারবার সংকটে জড়িয়ে ফেলেছে। ইরাক-পরবর্তী এই ব্যবস্থা কখনোই টেকসই ছিল না। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়তো শেষ পর্যন্ত এর ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
যুদ্ধ যা নিশ্চিত করেছে : যদি কিছু মিথ ভেঙে পড়ে থাকে, তবে কিছু বাস্তবতাও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ইসরাইলের প্রভাব: এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে মার্কিন নীতি নির্ধারণে ইসরাইলের ভূমিকা কতটা নির্ণায়ক। সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ এবং তা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাখ্যায় ওয়াশিংটনের যুক্তি প্রায় পুরোপুরিই জোটের ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইসরাইলের অগ্রাধিকারের বাইরে স্বাধীন কোনো কৌশলগত ব্যাখ্যা সেখানে খুব কমই দেখা যায়। এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী, তখনও মার্কিন নীতি প্রায় পুরোপুরি ইসরাইলের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি কোনো কাকতাল নয়। এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। জনমতের সঙ্গে নীতিনির্ধারণের এই দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা একটি কঠিন সত্য সামনে আনে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি মূলত গণতান্ত্রিক ঐকমত্য দ্বারা পরিচালিত হয় না বরং এটি নির্ধারিত হয় শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি এবং প্রভাবশালী লবিং নেটওয়ার্কের দ্বারা; যেগুলো ওয়াশিংটনকে ইসরাইলের আঞ্চলিক এজেন্ডার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বেধে রাখে।
বিদেশি যুদ্ধ নিয়ে দেশে ব্যাপক ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেস ও নির্বাহী শাখা সংঘাত বৃদ্ধির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। এই সমর্থনের পেছনের হিসাব জনমতের নয়, রাজনৈতিক। নির্বাচনি অর্থায়ন, লবিংয়ের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত জটিলতা; সব মিলিয়ে যুদ্ধক্লান্ত ভোটারদের পছন্দকে ছাপিয়ে গেছে। অনেক বছর ধরে বিশ্লেষকরা বলে আসছেন; মার্কিন নীতিতে ইসরাইলের প্রভাব গভীর। ইরান যুদ্ধ সেই যুক্তিকে তত্ত্বের পর্যায় থেকে সরিয়ে বাস্তব পর্যবেক্ষণে পরিণত করেছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা : ইরানকে প্রায়ই তার প্রকৃত শক্তির চেয়ে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পশ্চিমা কিছু মহলে ধারণা ছিল, দ্রুত নেতৃত্ব হত্যার মতো আঘাত হানলে রাষ্ট্রটি অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে ইরান উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। নির্ভুলতা ও ব্যাপকতার সঙ্গে পাল্টা আঘাত হেনেছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুমকি সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় করেছে। এর অর্থ এই নয় যে ইরান অজেয়। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে যে সহজে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ধারণা গভীরভাবে ভুল ছিল।
প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা : সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো— শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানো হলেও ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা নিশ্চিত করে। ইরান এমন একটি রাষ্ট্র, যার ভিত্তি কেবল ব্যক্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে নেই বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শীর্ষ নেতাদের হত্যাও বিশৃঙ্খলা বা ভাঙন তৈরি করতে পারেনি বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। তাৎক্ষণিক অভ্যন্তরীণ ভাঙনের প্রত্যাশা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
আঞ্চলিক জোটগুলোর স্থায়িত্ব : হিজবুল্লাহর মতো ইরানের মিত্ররা এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বিভিন্ন ধাক্কা ও কৌশলগত হিসাব থাকা সত্ত্বেও এই গোষ্ঠীগুলো আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহে প্রভাব ফেলতে থাকে। তাদের নিষ্ক্রিয় করা যায়নি। তারা অদৃশ্যও হয়ে যায়নি। আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বুঝতে হলে তাদের উপস্থিতিকে স্বীকার করতেই হবে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের মিথ : সবশেষে, এই যুদ্ধ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের ফাঁপা বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। ইরানে হস্তক্ষেপ, ভেনেজুয়েলার প্রতি অব্যাহত বৈরিতা এবং চলমান সামরিক সংশ্লিষ্টতা দেখায় যে, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এখনও বিশ্বব্যাপী শক্তি প্রক্ষেপণের ওপর ভিত্তি করে আছে। সংযমের ভাষা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ছিল। কিন্তু হস্তক্ষেপের নীতি এখনও অব্যাহত।
এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত : ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হয়তো শেষ পর্যন্ত ভূখণ্ড পরিবর্তনের জন্য নয় বরং চিন্তাগত পরিবর্তনের জন্য বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি আমেরিকান সুরক্ষার ধারণা, ইসরাইলের আঞ্চলিক অভিভাবকত্ব, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা-অভেদ্যতা এবং ইরানের দুর্বলতার মতো বহু মিথ ভেঙে দিয়েছে।
একই সঙ্গে এটি কিছু গভীর বাস্তবতাকে নিশ্চিত করেছে। যেমন : প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ওয়াশিংটনের নীতিতে হস্তক্ষেপবাদী ধারা এখনও শক্তিশালী।
ইতিহাস রাতারাতি বদলায় না। কিন্তু যখন দীর্ঘদিনের আখ্যানগুলো ঘটনার চাপে ভেঙে পড়ে, তখনই একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত তৈরি হয়। এই যুদ্ধ হয়তো সেই মুহূর্তই।
লেখক : ফিলিস্তিনি আমেরিকান সাংবাদিক। (সূত্র : জি নেট)