পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ জুড়ে রয়েছে সমুদ্র। এই বিশাল জলরাশির নিচে লুকিয়ে আছে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিপুল মৎস্যভাণ্ডার। আবার বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই নির্ভর করে সমুদ্রপথে চলাচলের ওপর। তাই সমুদ্র শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়— এটি আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই সমুদ্রের কোন অংশ কার? আর কীভাবে নির্ধারিত হয় একটি দেশের সমুদ্রসীমা? আজ বিশ্ব সমুদ্র দিবসে জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে সমুদ্র ভাগ হয়।
এই জটিল কাঠামোর ভিত্তি হলো জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সনদ বা ইউএনসিএলওএস (ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন অন দ্য ল' অব দ্য সি), যা ১৯৮২ সালে গৃহীত হয় এবং বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ অনুসরণ করে।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ভিত্তি কী?
আন্তর্জাতিক আইনে সমুদ্রসীমা শুরু হয় সরাসরি উপকূল থেকে নয়, বরং একটি কল্পিত রেখা থেকে— যাকে বলা হয় ‘বেসলাইন’। সাধারণত উপকূলের সর্বনিম্ন জোয়ারের সময় পানির যে সীমা থাকে, সেটিকেই বেসলাইন হিসেবে ধরা হয়। এই রেখা থেকেই পরবর্তী সব সামুদ্রিক অঞ্চল— ১২ নটিক্যাল মাইল, ২০০ নটিক্যাল মাইল বা তারও বেশি পরিমাপ করা হয়।
এই বেসলাইনের সামান্য পরিবর্তনও একটি দেশের সমুদ্রসীমাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অনেক ক্ষেত্রেই এই রেখা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।
অভ্যন্তরীণ জলসীমা : যেখানে রাষ্ট্রের পূর্ণ ক্ষমতা
বেসলাইনের ভেতরের জলভাগকে বলা হয় অভ্যন্তরীণ জলসীমা। এর মধ্যে নদী, বন্দর, মোহনা, উপসাগর ও হ্রদ অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব তার স্থলভাগের মতোই পূর্ণ ও একচ্ছত্র। বিদেশি কোনো জাহাজ এখানে প্রবেশ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
১২ নটিক্যাল মাইল : আঞ্চলিক সমুদ্র ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ
বেসলাইন থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে বলা হয় আঞ্চলিক সমুদ্র। এখানে উপকূলীয় রাষ্ট্র পূর্ণ সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করে। যেমন- আইন প্রয়োগ, নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনা সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে আন্তর্জাতিক আইন বিদেশি জাহাজকে একটি শান্তিপূর্ণ চলাচলের জন্য অধিকার দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো জাহাজ যদি কোনো ক্ষতিকর উদ্দেশ্য ছাড়া এই অঞ্চল অতিক্রম করে, তবে সাধারণত তাকে বাধা দেওয়া যায় না।
কিন্তু এই অধিকার তখনই বাতিল হয় যখন কোনো জাহাজ সামরিক মহড়া চালায়, গুপ্তচরবৃত্তি করে, অস্ত্র ব্যবহার করে, মাছ শিকার করে বা পরিবেশ দূষণ ঘটায়।
২৪ নটিক্যাল মাইল : নজরদারির বিশেষ এলাকা
আঞ্চলিক সমুদ্রের বাইরে আরও ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকে বলা হয় সংলগ্ন সমুদ্রাঞ্চল। এখানে কোনো দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নেই, তবে শুল্ক, কর, অভিবাসন এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইন প্রয়োগের বিশেষ অধিকার রয়েছে।
এই কারণে অনেক দেশ এই অঞ্চলকে চোরাচালান, অবৈধ অভিবাসন এবং আইন লঙ্ঘন প্রতিরোধের জন্য কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে।
২০০ নটিক্যাল মাইল : অর্থনৈতিক অধিকার ও প্রতিযোগিতার কেন্দ্র
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই অঞ্চলে উপকূলীয় রাষ্ট্রের রয়েছে মাছ ধরার একচ্ছত্র অধিকার, তেল ও গ্যাস উত্তোলনের অধিকার, খনিজ সম্পদ ব্যবহারের অধিকার এবং সামুদ্রিক জ্বালানি উৎপাদনের অধিকার।
তবে এটি পূর্ণ সার্বভৌম এলাকা নয়। অন্য দেশ এখানে জাহাজ চলাচল, বিমান উড্ডয়ন এবং সমুদ্রতলে কেবল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সামুদ্রিক বিরোধের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলো এই ইইজেড।
মহীসোপান : সমুদ্রতলের সম্পদের লড়াই
মহীসোপান হলো সমুদ্রতলের সেই অংশ, যা একটি দেশের স্থলভাগের প্রাকৃতিক সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি কমপক্ষে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকলে এটি ৩৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাড়ানো যায়। এই অঞ্চলে থাকা তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের ওপর সংশ্লিষ্ট দেশের বিশেষ অধিকার থাকে।
কেন সৃষ্টি হয় সমুদ্রসীমা বিরোধ?
সমুদ্রসীমা বিরোধ সাধারণত তখনই শুরু হয়, যখন দুই বা ততোধিক দেশের দাবি করা সমুদ্রাঞ্চল একে অপরের ওপর আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ওভারল্যাপ করে।
বিশেষ করে যখন দুদেশের মধ্যবর্তী দূরত্ব ৪০০ নটিক্যাল মাইলের কম হয়, তখন উভয় দেশই ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড দাবি করলে সংঘাত সৃষ্টি হয়।
এছাড়া দ্বীপের মালিকানা, ছোট শিলাখণ্ডকে দ্বীপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ঐতিহাসিক দাবি এবং সম্পদের অবস্থান— এসব বিষয় বিরোধকে আরও জটিল করে তোলে।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক আদালতের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল সাধারণত তিন ধাপে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে— প্রথমে সমদূরত্ব ভিত্তিতে একটি মধ্যরেখা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, উপকূলের আকৃতি, দ্বীপের উপস্থিতি এবং ঐতিহাসিক ব্যবহার বিবেচনা করা হয়। সবশেষে দেখা হয়, নির্ধারিত সীমারেখা কোনো পক্ষের জন্য অযৌক্তিক সুবিধা বা ক্ষতি তৈরি করছে কি না।
ছোট দ্বীপ বড় রাজনীতি
সমুদ্রসীমা নির্ধারণে ছোট দ্বীপ বা শিলাখণ্ডের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ‘দ্বীপ’ আন্তর্জাতিক আইনে ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক সমুদ্র এবং ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড তৈরি করতে পারে। কিন্তু ‘শিলা’ হিসেবে বিবেচিত হলে সেটি সীমিত সমুদ্রসীমা পায় এবং ইইজেড দাবি করতে পারে না। এই পার্থক্যই বহু আন্তর্জাতিক বিরোধের জন্ম দেয়।
দক্ষিণ চীন সাগর : চলমান উত্তেজনার প্রতীক
চীন, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও তাইওয়ান— সবাই দক্ষিণ চীন সাগরের বিভিন্ন অংশ দাবি করে। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল চীনের ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দাবিকে আইনি ভিত্তিহীন ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা এখনো রাজনৈতিকভাবে সমাধান হয়নি।
বাংলাদেশের উদাহরণ : কূটনৈতিক বিজয়
বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধে জড়িত ছিল।
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ২০১২ ও ২০১৪ সালে পৃথক রায়ে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে বিপুল সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার অর্জন করে। এর ফলে দেশের জন্য তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং ‘ব্লু ইকোনমি’ বিকাশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।
আইন থাকলেও বাস্তবতা জটিল
ইউএনসিএলওএস অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আদালতের রায় বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র তা না মানলে সরাসরি প্রয়োগের শক্তিশালী ব্যবস্থা নেই। ফলে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ অনেক সময় আইনের পাশাপাশি কূটনীতি, রাজনৈতিক চাপ এবং শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ইরান–যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার সময় ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা সীমিত করার হুমকি দেয়। এর ফলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে।
কারণ বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ— বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের তেল এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক তেলবাহী ট্যাংকার পারাপার করে, যা ইউরোপ, এশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হরমুজ একটি ‘ট্রানজিট প্যাসেজ’ রুট, অর্থাৎ এখানে কোনো দেশ এককভাবে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না। তবুও বাস্তবে সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাতের সময় এই প্রণালীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে এবং জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়, শিপিং বীমার খরচ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
সমুদ্র শুধু জলরাশি নয়— এটি রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত শক্তির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। আন্তর্জাতিক আইন সমুদ্রকে ভাগ করে একটি কাঠামো দিলেও বাস্তবে রাজনৈতিক জলসীমা কখনো নির্ধারিত থাকে না। ফলে সমুদ্রের নীল জলরাশির নিচে লুকিয়ে থাকা সম্পদের মতোই জটিল ও চলমান হয়ে আছে তার রাজনৈতিক মানচিত্রও।
/ইউএমএইচ