হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। আলোচনায় অগ্রগতি হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আবারও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বৃহত্তর কূটনৈতিক আলোচনার পথও খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরান বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) জানিয়েছে, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে নতুন জাহাজ চলাচলের রুটের অবস্থান নির্ধারণে সমঝোতা হয়েছে। তবে চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই পথ বন্ধ বা অচল হয়ে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাত শুরুর পর তেহরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। পরে আংশিকভাবে চালু করলেও জাহাজগুলোকে ইরানের জলসীমা দিয়ে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ জোরদার করে। এরপর থেকেই উত্তেজনা কমাতে ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা শুরু হয়।
কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে?
বর্তমান আলোচনার মূল বিষয় দুটি—
প্রথমত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কে নিয়ন্ত্রণ করবে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে কোনো ধরনের সেবা ফি নেওয়া হবে কি না।
আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে, আর উপসাগর থেকে বের হওয়া জাহাজ ওমানের জলসীমা দিয়ে চলবে। এই ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের জন্য কার্যকর হতে পারে। ওই সময়ে কোনো ট্রানজিট ফি না নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
ইরান কী চায়?
ইরানের দাবি, তাদের জলসীমা দিয়ে যাওয়া জাহাজের নিরাপত্তা ও চলাচল ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা থাকতে হবে। তেহরান বলছে, হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমান— দুই দেশের উপকূল ঘেঁষে হওয়ায় উভয় দেশের যৌথভাবে এটি পরিচালনা করা উচিত।
ইরান আরও চায়, ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা— যেমন নৌ-নির্দেশনা, নিরাপত্তা বা পরিবেশ সুরক্ষার বিনিময়ে ফি নেওয়ার সুযোগ রাখা হোক। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য টোল নেওয়া যায় না, তবে নির্দিষ্ট সেবার জন্য ফি আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক হয়েছে এবং জাহাজের যাওয়া-আসার জন্য নিরাপদ রুট তৈরিতে অগ্রগতি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী চায়?
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ যেন কোনো বাধা, অনুমতি বা অতিরিক্ত ফি ছাড়াই চলাচল করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রণালি খুব দ্রুত খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানকে জাহাজ চলাচলের জন্য অর্থ আদায়ের সুযোগ দিতে তিনি রাজি নন।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো চুক্তি চান না যেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হবে।
ওমানের ভূমিকা কী?
ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। হরমুজ প্রণালির একটি অংশ ওমানের জলসীমার মধ্যেও রয়েছে। তাই দেশটি এমন একটি সমাধান চায়, যাতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকে এবং দুই পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ওমানের একটি প্রস্তাব হলো, মালাক্কা প্রণালির মতো একটি ব্যবস্থা চালু করা, যেখানে জাহাজগুলো স্বেচ্ছায় নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অর্থ প্রদান করতে পারে।
আলোচনায় কী কী প্রস্তাব রয়েছে?
বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—
উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে।
বেরিয়ে যাওয়া জাহাজ ওমানের জলসীমা দিয়ে চলবে।
প্রথম ৬০ দিন কোনো ট্রানজিট ফি নেওয়া হবে না।
প্রণালিতে পেতে রাখা নৌ-মাইন অপসারণ করা হবে।
পরবর্তী সময়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা হবে।
এখনও যেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে
যদিও আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে, তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অমীমাংসিত।
এর মধ্যে রয়েছে— দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, ইরান ভবিষ্যতে সেবা ফি নিতে পারবে কি না, আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে কি না এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় কোনো ছাড় দেবে কি না।
চুক্তি হলে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমবে এবং তেলের দাম স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু হরমুজ নিয়ে সমঝোতা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সব সংকটের সমাধান হবে না। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননের পরিস্থিতি, ইয়েমেনে হুথিদের হামলা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ বহাল থাকবে। তাই সম্ভাব্য এই চুক্তিকে বড় সংকট সমাধানের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ