নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানির ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের উদাহরণ এবং বিশ্ববাসীর জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় বালেন্দ্র শাহ বলেন, নেপালে সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর সামনে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তার একটি ইঙ্গিত।
তিনি বলেন, এই বিপর্যয় ছিল বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আজ আমি আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই— আপনারা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছেন?
গত মাসে নেপালের হিমালয়সংলগ্ন এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, ঘরবাড়ি ও মানুষের জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক সপ্তাহ পরও দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান কার্যক্রম চলছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ৬ হাজারের বেশি মানুষ তখনও নিখোঁজ ছিলেন। তাদের অনেককেই আর খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে বলে জানিয়েছেন শাহ।
জলবায়ু সংকটে নেপালের দায় সামান্য
বালেন্দ্র শাহ বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান এক-দশমাংশ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে নেপালকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এই সংকট তৈরি করিনি, অথচ এর জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে বরফ ও পারমাফ্রস্ট গলার মতো পরিবর্তনগুলো হিমবাহের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে নেপালের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী বন্যার যোগসূত্র রয়েছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
পুনর্গঠনে বড় অর্থের প্রয়োজন
বন্যার পর নেপালের পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহ। তাঁর দেওয়া হিসাবে, দুর্যোগের পর দেশটির পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
অন্যদিকে নেপালের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় দেশটির আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি ডলার এবং ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র দেশগুলোকে পুনর্গঠনের জন্য নতুন করে বড় ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন ঋণের পরিবর্তে পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক সহায়তা।
তিনি বলেন, কোনো দরিদ্র দেশের অবকাঠামো জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেলে তার সমাধান হিসেবে শুধু বড় ঋণ বা ছোট ছোট অনুদান যথেষ্ট নয়। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন।
জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থার সমালোচনা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাওয়ার প্রক্রিয়াকে জটিল ও আমলাতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিপর্যয়ের পর ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে রাখা উচিত নয়।
নেপাল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল থেকে ২ কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপাল-ভারত-চীনের সহযোগিতার আহ্বান
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন শাহ।
তিনি নেপাল, ভারত ও চীনের মধ্যে একটি কার্যকর আঞ্চলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্যাটেলাইট তথ্য বিনিময়, হিমবাহ ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সীমান্তবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।
তার মতে, হিমালয় অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের দুর্যোগ ঘটলে তার প্রভাব এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে তথ্য ও প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং দ্রুত সমন্বয় জরুরি।
আন্তর্জাতিক সহায়তা
দুর্যোগের পর নেপালের পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আসছে। বিশ্বব্যাংক জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের জন্য নেপালকে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চলতি সপ্তাহে নেপালকে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে দুর্যোগের পর নেপালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিসির খানালও জাতিসংঘে জলবায়ু সম্মেলনে বলেন, নেপালে যা ঘটেছে, সেটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বিশ্বের অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিরও একটি পূর্বাভাস হতে পারে।
বালেন্দ্র শাহর ভাষণের মধ্য দিয়ে নেপাল আবারও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো এবং জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করার দাবি তুলেছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ