তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে মমতার তৃণমূল

সময়ের আলো ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিবঙ্গের মসনদে থাকা রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচনের পর একের পর এক নাটকীয়তায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে

2026-06-09T01:40:57+00:00
2026-06-09T01:40:57+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে মমতার তৃণমূল
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১:৪০ এএম   (ভিজিট : ১৪)
বিধানসভার পর এবার লোকসভাতেও ভেঙে গেল তৃণমূল কংগ্রেস। সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিবঙ্গের মসনদে থাকা রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচনের পর একের পর এক নাটকীয়তায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বিধানসভার পর এবার লোকসভাতেও ভেঙে গেল তৃণমূল কংগ্রেস। 

দলটির মোট ২৯ জন লোকসভা সদস্যের (বসিরহাটের সাংসদ হাজি নুরুলের মৃত্যুর কারণে আসনটি বর্তমানে খালি) মধ্যে ২০ জন সাংসদই দলত্যাগ বিরোধী আইন বাঁচিয়ে একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। তারা স্পিকার ওম বিড়লার কাছে চিঠি দিয়ে সংসদে আলাদা ব্লক গঠন এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

সবচেয়ে নাটকীয় বিষয় হলো, যখন দিল্লিতে দলের এই চরম অস্তিত্ব সংকট ঘনীভূত হচ্ছিল, ঠিক তখনই বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠকে যোগ দিতে রাজধানীতে অবস্থান করছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। 

একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী জোটের বৈঠকে সোনিয়া গান্ধীর পাশে বসে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই লুটিয়েন্স দিল্লির মোতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সরকারি বাসভবনে বসে ঘাসফুল শিবিরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করছিল বিজেপি নেতৃত্ব।

সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর থেকেই তৃণমূলের ভেতরে অসন্তোষের যে আগুন জ্বলছিল, তা সোমবার এক মহাবিস্ফোরণের রূপ নেয়। এদিন সকালে রাজ্যসভার প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায় দল ও সংসদীয় পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ক্ষোভ উগরে বলেন, দল জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আরজি কর কাণ্ডের পর চেয়েছিলাম দল ব্যবস্থা নিক, কিন্তু তারা দোষীদের আড়াল করে গেছে। 

এরপরই নাটকের মূলপর্ব শুরু হয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে। সেখানে একে একে হাজির হন তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী লোকসভা সাংসদ। এই বৈঠকে বিজেপির নিশিকান্ত দুবে, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। ঘণ্টা দুয়েকের এই বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় যে, দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ (১৯ জন) সদস্যের গণ্ডি পেরিয়ে ২০ জন সাংসদ স্পিকারের কাছে আলাদা বসার আবেদন জানাবেন।

বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে রয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তাকে সম্প্রতি লোকসভার দলনেত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল তৃণমূল। তার সঙ্গে উপনেতা হিসেবে হাত মিলিয়েছেন বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। 

চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, আমারসহ তৃণমূলের প্রায় ২০ জন এমপি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছি। আমরা বাংলায় নির্বাচনের রায় মেনে নিয়েছি এবং আমরা বিশ্বাস করি যে আমাদের ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পথ এনডিএ জোটের সঙ্গেই মেলানো উচিত। 

বিদ্রোহী শিবিরের আরেক সাংসদ শর্মিলা সরকার প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, দলের ভেতরের তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে কোনো কাজ করা যাচ্ছিল না এবং এর কোনো প্রতিকারও ছিল না।

এই ভাঙন কেবল সংখ্যার হিসেবেই তৃণমূলকে পঙ্গু করেনি, বরং মমতার আজীবনের রাজনৈতিক অর্জনকে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে দিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ একসঙ্গে দল ছাড়ায় তাদের সাংসদ পদ খারিজ হবে না। ফলে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠীই এখন সংসদে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করতে পারবে। 

এমনকি ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তৃণমূলের নির্বাচনী প্রতীক ‘জোড়া ঘাসফুল’-এর ওপরও আইনি দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে তারা। ঠিক যেভাবে মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরে বা শারদ পাওয়ারদের হাত থেকে তাদের দল ও প্রতীক ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

তৃণমূলের এই ২০ জন বিদ্রোহীর তালিকায় ওপার বাংলার বিনোদন জগৎ ও ক্রীড়া ক্ষেত্রের একাধিক হাই-প্রোফাইল মুখ রয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জুন মালিয়া, দীপক (দেব) অধিকারী এবং শত্রুঘ্ন সিনহা। আরও আছেন প্রাক্তন ফুটবলার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান। এ ছাড়া পার্থ ভৌমিক, অরূপ চক্রবর্তী, খলিলুর রহমান, আবু তাহের ও সাজদা আহমদের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারাও এই তালিকায় শামিল হয়েছেন।

এই ভাঙনের পর ২৯ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে অবশিষ্ট রইলেন মাত্র ৮ জন। তারা হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, মালা রায়, সায়নী ঘোষ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজাদ। রাজ্যসভাতেও সুখেন্দু শেখরের ইস্তফার পর তৃণমূলের শক্তি কমে দাঁড়িয়েছে ১২ জনে এবং সেখানেও পরবর্তী ভাঙনের ছক কষছে বিজেপি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ভাঙন পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের রাজনীতির অবসান বা এক যুগের একাধিপত্যের সমাপ্তিরই স্পষ্ট ইঙ্গিত। রাজ্য রাজনীতিতে যে পতন শুরু হয়েছিল তা এখন কেন্দ্রীয় স্তরে গিয়ে ঠেকেছে। এর আগে রাজ্য স্তরে আইনপ্রণেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৮০ জনেরও বেশি বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়ক দলীয় কর্মকাণ্ড বয়কট করে বিদ্রোহের সুর বেঁধেছিলেন। 

দলের অভ্যন্তরে মমতার প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব যে পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে নেত্রীকে কর্মীরা সশ্রদ্ধ ‘দিদি’ বলে ডেকে এসেছেন, এখন অনেক বিদ্রোহী সাংসদই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তাকে সরাসরি নাম ধরে ‘মমতা’ বলে সম্বোধন করছেন। খেলাধুলা ও রুপালি জগৎ থেকে আসা সাংসদদের এই আচরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে, দলে মমতার সেই পুরোনো ক্যারিশমা ও ভয়- দুই-ই আজ উধাও।

এদিকে দিল্লিতে এনডিএর মাস্টারস্ট্রোকে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে করুণ আত্মসমর্পণ করেছেন মমতা। যেদিন দিল্লিতে বিজেপি ‘অপারেশন লোটাস’ কার্যকর করে মমতার পায়ের তলা থেকে রাজনৈতিক জমি কেড়ে নিচ্ছিল, সেদিনই দিল্লির ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের বৈঠকে অংশ নেন মমতা ও অভিষেক। একসময় যিনি কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করতেন এবং রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, সোমবারের বৈঠকে সেই মমতাকেই দেখা গেল অত্যন্ত অসহায়ভাবে সোনিয়া গান্ধীর পাশে বসে থাকতে।

বৈঠক শেষে যখন জোটের চেয়ারপারসন মল্লিকার্জুন খাড়গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নির্বাচন চুরি ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সরব হচ্ছিলেন, তখন তার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন মমতা। কিন্তু নিজের দলের এই ঐতিহাসিক ভাঙনে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ম্রিয়মাণ তৃণমূল নেত্রী সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। মুখ না খুলেই তিনি সভাস্থল ত্যাগ করেন।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলায় ক্ষমতা হারানোর পর দিল্লিতেও দলীয় অস্তিত্ব বিলীন হওয়ায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে এখন কংগ্রেসের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক ‘সাহারা’ বা বিকল্প পথ খোলা নেই। 

অন্যদিকে তৃণমূল ও ডিএমকের পরাজয়ে বিজেপি লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য পূরণের দিকে একধাপ এগিয়ে গেল। এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বাংলার মসনদ হারানোর পর এবার জাতীয় রাজনীতি থেকেও কার্যত প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে একদা অপরাজেয় অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   ভেঙে পড়ছে  মমতা  তৃণমূল  পশ্চিবঙ্গ 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: