ইরান-ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে ফের ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে ইসরাইলি হামলার জবাবে স্থানীয় সময় সোমবার সকালেও ইসরাইলে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। মুহুর্মুহু ইরানি মিসাইলের আঘাত ঠেকাতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয় ইসরাইলি সেনারা।
ইরাক, সৌদি আরব ও জর্ডানেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে লেবাননেও হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরাইল। জবারে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিরাও। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব আল মান্দেব প্রণালিও বন্ধের হুমকি দিয়েছে তেহরান।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানে হামলা চালিয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাল ইসরাইল। ট্রাম্পের নির্দেশমতো পাল্টা হামলা না চালাতে নেতানিয়াহু রাজি হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ইরানে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইসরাইলি সেনারা।
দেশটির পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরান ছাড়াও তাবরিজ ও ইসফাহানে শোনা গেছে মুহুর্মুহু হামলার শব্দ। লেবাননেও হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে আইডিএফ। দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বাড়ানো হয়েছে হামলার মাত্রা। সবশেষ খবর অনুযায়ী হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে ইরান-ইসরাইল।
পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। ইরানও ইসরাইলি হামলার জবাবে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। জেরুজালেমে শোনা গেছে সাইরেনের শব্দ। ইসরাইলি স্বার্থে কাজ করা ইরাকের কুর্দিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার করার দাবিও করছে ইরান।
এ ছাড়া জর্ডানের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থাকার খবরে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার রাতে এই সতর্কতা জারি করা হয়। এ ছাড়া সৌদি আরবের আল-খারিজ প্রদেশে থাকা বিমানঘাঁটিতে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে হামলার কথা অস্বীকার করেছে ইরান।
এ অবস্থায় আইডিএফ বলছে, মারাত্মক ভুল করেছে তেহরান, অবশ্যই তাদের খেসারত গুনতে হবে। পাশাপাশি লেবাননে আগ্রাসন আরও বেশি জোরালো করার হুমকিও দিয়েছে তেল আবিব। অন্যদিকে ইয়েমেন থেকে হুথিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবিও করছে ইসরাইল।
আইডিএফের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন বলেন, ইরান অনেক বড় ভুল করেছে। এখন আইডিএফ লেবাননজুড়ে হামলা আরও জোরালো করবে। হিজবুল্লাহর ওপর আঘাত আরও তীব্র করবে। আমরা ইসরাইলের ওপর গোলাবর্ষণ চলতে দেব না।
এ অবস্থায় এপ্রিলে হওয়া যুদ্ধবিরতির পর আবারও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরান-ইসরাইল। লেবাননে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রাখায় রোববার রাতে প্রথমে ইসরাইলে মুহুর্মুহু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় আইআরজিসি। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে হাইফা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইসরাইলের রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটি। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঢেউ মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হয় ইসরাইলি সেনাদের।
এরপর থেকেই সতর্ক অবস্থানে ছিল তেহরান। এরই অংশ হিসেবে তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থগিত রাখা হয় ফ্লাইট চলাচল। এখন হামলা-পাল্টা হামলা উত্তেজনায় আকাশসীমা বন্ধ করেছে তেহরান। এ ছাড়া শত্রুদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষেও লিপ্ত হতে প্রস্তুত বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের স্পিকার ও শীর্ষ আলোচক বাঘের গালিবাফ।
ইরানে হামলার জেরে ইসরাইলকে আরও কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে তেহরান। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতেই লেবাননে ইসরাইল হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ আইআরজিসির। এ ছাড়া ইসরাইল হামলা অব্যাহত রাখলে হরমুজ প্রণালি ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নৌ রুট বাব আল মান্দেব প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়েছে ইরান।
আইআরজিসির মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফিকার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতে লেবাননের নিপীড়িত জনগণের বিরুদ্ধে নৃশংসতা বাড়িয়েছে ইসরাইল। আমরা আগেই সতর্ক করেছিলাম যে, যদি বৈরুতের উপকণ্ঠে আগ্রাসন বাড়ে, তবে আমরা অধিকৃত অঞ্চলের ইসরাইলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাব। তারা পাল্টা হামলা চালানোয় ইরানের পদক্ষেপ আরও মারাত্মক হবে।
শান্তি আলোচনার মধ্যে ইরান-ইসরাইলে পাল্টাপাল্টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা ফের তুঙ্গে। এমন উত্তেজনায় শান্তিচুক্তির আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা প্রকট হচ্ছে। যদিও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া নেতানিয়াহুর সামনে ‘কোনো বিকল্প নেই’।
নেতানিয়াহু সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেউ নন, সব সিদ্ধান্ত তিনিই নেন। এখন প্রশ্ন হলো- তবে কি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইশারায় ইরানে পাল্টা হামলা চালাল ইসরাইল। নাকি ট্রাম্পের নাকে উপেক্ষা করেই ইরানে হামলা চালাল ইসরাইল।
এদিকে পুনরায় যুদ্ধে ফিরতে নয়, বরং নিজেদের প্রতিরোধ সক্ষমতার বার্তা দিতেই ইসরাইলে নতুন করে হামলা চালিয়েছে ইরান। যুদ্ধবিরতির পর ইরান-ইসরাইল পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে এমন মন্তব্য করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আর নতুন করে যুদ্ধ শুরুর শঙ্কা থাকলেও ইসরাইলি ভূখণ্ডে আইআরজিসির হামলায় উচ্ছ্বসিত ইরানের সাধারণ মানুষ।
গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর প্রথমবারের মতো মিত্র দেশ লেবাননে আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে ইসরাইলের আকাশসীমায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান। রাতের অন্ধকারে ইরানের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মুহুর্মুহু আঘাতে মুহূর্তেই আলোর ঝলকানি তেল আবিবের আকাশে।
এদিকে তেল আবিবে আইআরজিসির হামলার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়তেই তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ। হাতে ইরান ও হিজবুল্লাহর পতাকা ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনির ছবি নিয়ে ইরানপন্থি নানা সেøাগান দেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, আমি আনন্দিত। আমাদের এ অঞ্চলে ইসরাইলের দখলদারিত্ব ভেঙে দিতে লেবাননের জনগণ ও শিয়াদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
অন্য আরেকজন বলেন, হামলার বিপরীতে পাল্টা হামলা চালাবে। কিন্তু এতে ভয় পাচ্ছি না। অবকাঠামোর একবার ধ্বংস হলে আবার গড়া সম্ভব। কিন্তু জাতীয় গর্ব একবার ক্ষুণ্ন হলে, আলোচনা দ্বারা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে তেহরান-তেল আবিব হামলা-পাল্টা হামলার জেরে আতঙ্কে ইসরাইলের বাসিন্দারা। সোমবার অধিকৃত জেরুজালেম ও হাইফার স্কুলগুলোতে ছিল না শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। এ ছাড়া হামলা থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তেল আবিবের সাধারণ মানুষ। হামলার শঙ্কা থাকলেও নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতির পক্ষেই সাফাই গান তারা।
স্থানীয় একজন বলেন, আমি মনে করি এটাই উপযুক্ত সময় ইরানে আক্রমণের। যুদ্ধে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা সেনা হারিয়েছি। কিন্তু এটা ইসরাইলের বিষয়। তাই যা সিদ্ধান্ত আমরাই নেব। অন্য আরেকজন বলেন, ইরানিরা ভুলে যাচ্ছে ইসরাইলিরা শক্তিশালী। আমরা ভীত নয়। আমি আশা করি ট্রাম্পও বুঝতে পারবে ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না।
সময়ের আলো/জেডি