মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, তার দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের ‘প্রায় অফুরন্ত মজুদ’ রয়েছে। অন্যদিকে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র যতটা ভাবছে, তার চেয়েও বেশি সময় ধরে ‘শত্রুকে প্রতিহত করার সক্ষমতা’ তাদের আছে। মুখে এসব বললেও দুই পক্ষেরই অস্ত্র নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে।
কেবল অস্ত্রের মজুদ আর সরবরাহই এই সংঘাতের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে না; যেমনটা ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, যেখানে রাশিয়ার সৈন্য ও অস্ত্রের বিশাল বহর থাকা সত্ত্বেও তারা দীর্ঘদিন লড়ছে। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় নিয়ামক। শুরু থেকেই যুদ্ধের গতিবিধি বেশ তীব্র। উভয় পক্ষই বর্তমানে যে গতিতে অস্ত্র তৈরি করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে তা ব্যবহার করে ফেলছে।
তেল আবিব ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ (আইএনএসএস) অনুমান করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এরই মধ্যে দুই হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে, যার প্রতিটিতেই একাধিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আইএনএসএসের তথ্যমতে, ইরান ইতিমধ্যে ৫৭১টি মিসাইল এবং ১ হাজার ৩৯১টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই মাঝপথে আটকে দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, উভয় পক্ষের জন্যই এই মাত্রার লড়াই চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ইরান : পশ্চিমা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান থেকে নিক্ষেপ করা মিসাইলের সংখ্যা ইতিমধ্যেই কমে এসেছে। যুদ্ধের প্রথম দিনে যেখানে শত শত মিসাইল ছোড়া হয়েছিল, এখন তা ডজনে নেমে এসেছে।
যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে দুই হাজারের বেশি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইলের মজুদ রয়েছে। তবে কোনো দেশের সামরিক বাহিনীই তাদের প্রকৃত অস্ত্রের সংখ্যা প্রকাশ করে না, শত্রুকে অন্ধকারে রাখতেই এমন গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়।
আমেরিকার শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল ড্যান কেইন বুধবার জানিয়েছেন, শনিবার যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপের হার ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলছে, শুধু গত ২৪ ঘণ্টাতেই এই হার ২৩ শতাংশ কমেছে।
যুদ্ধের আগে ধারণা করা হতো ইরান বিপুল পরিমাণে ‘শাহেদ’ সুইসাইড (ওয়ানওয়ে) ড্রোন তৈরি করেছে। তারা এই প্রযুক্তি রাশিয়ায় রফতানি করেছে, যা ইউক্রেনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এই ড্রোনের নকশা নকল করেছে। তবে জেনারেল কেইন বলেন, সংঘাতের প্রথম দিন থেকে ইরানের ড্রোন হামলার হার ৭৩ শতাংশ কমেছে। দেখে মনে হচ্ছে, ইরান যুদ্ধের এই তীব্র গতি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এমনও হতে পারে যে, অস্ত্রের মজুদ ধরে রাখতেই ইরান এই নাটকীয় হ্রাস ঘটিয়েছে; তবে উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো এখন ইরানের আকাশে নিজেদের পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ইরানের বেশিরভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের কোনো নির্ভরযোগ্য বিমানবাহিনীও আর অবশিষ্ট নেই। সেন্টকম জানিয়েছে, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন লঞ্চার, অস্ত্রের গুদাম এবং এসব তৈরির কারখানাগুলো ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষে এখন ইরানের লড়াইয়ের সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়তো সহজ হবে। কিন্তু তাদের সব অস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করা বেশ কঠিন।
ইরান আকারে ফ্রান্সের চেয়েও তিনগুণ বড় একটি দেশ। আকাশপথে নজরদারি এড়িয়ে এখনও অস্ত্র লুকিয়ে রাখা সম্ভব।
সাম্প্রতিক ইতিহাসও প্রমাণ করে, শুধু আকাশপথে যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া যায় না। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যাপক বোমা হামলা চালানোর পরও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী গাজায় হামাসকে ধ্বংস করতে পারেনি। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীরাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বছরব্যাপী বোমা হামলা থেকে নিজেদের এবং নিজেদের কিছু অস্ত্র বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র : যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। তাদের প্রচলিত অস্ত্রের মজুদ যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী মূলত ব্যয়বহুল ‘প্রিসিশন-গাইডেড’ (নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম) অস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা সীমিত পরিমাণে তৈরি হয়। ট্রাম্প চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে উৎপাদন ত্বরান্বিত করার জন্য প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আমেরিকার রসদও হয়তো ফুরিয়ে আসার পথে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন যেহেতু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে অবাধে হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে, তাই তাদের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে।
জেনারেল কেইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ‘স্ট্যান্ড-অব উইপনস’ অর্থাৎ টোমাহক ক্রুজ মিসাইলের মতো ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার থেকে সরে এসেছে। মার্কিন বিমানবাহিনী এখন তুলনামূলক সস্তা ‘স্ট্যান্ড-ইন উইপনস’ ব্যবহার করছে, যেমন জেডিএএম বোমা, যা সরাসরি লক্ষ্যের ওপর ফেলা যায়।
ওয়াশিংটন ভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মার্কিন মেরিন কর্পসের সাবেক কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, দূর থেকে প্রাথমিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন কম দামের মিসাইল ও বোমা ব্যবহার করতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের যুদ্ধ প্রায় অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে যেতে পারবে। যুদ্ধ যত লম্বা হবে, লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও ছোট হয়ে আসবে, যার মানে যুদ্ধের গতি ধীরে ধীরে কমে আসবে।
আকাশ প্রতিরক্ষা : মার্ক ক্যানসিয়ান জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হাজার হাজার জেডিএএম বোমা থাকলেও দামি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদ কম। সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের পাল্টা হামলা থেকে বাঁচতে এগুলো অপরিহার্য ছিল।
শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, তার আরব মিত্র এবং ইউক্রেনের কাছেও প্যাট্রিয়ট মিসাইলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দাম ৪০ লাখ ডলারেরও (৩০ লাখ পাউন্ড) বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বছরে প্রায় ৭০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করে। ইরান যদি এখনও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়তে সক্ষম হয়, তবে তা এই সীমিত মজুদ আরও কমিয়ে দেবে।
সিএসআইএস বিশেষজ্ঞ ক্যানসিয়ান অনুমান করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল থাকতে পারে, যা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরও ফুরিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আকাশ থেকে ভূমিতে হামলা দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে পারলেও আকাশ প্রতিরক্ষার বিষয়টি একটু বেশি অনিশ্চিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি প্যাট্রিয়ট মিসাইলের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনতে রাজি হন, তবে আমার মনে হয় আমরা ইরানিদের চেয়ে বেশি দিন টিকতে পারব; তবে এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হবে।
চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে ট্রাম্প মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যে বৈঠক করতে যাচ্ছেন, তা প্রমাণ করে যে অস্ত্রের মজুদ নিয়ে তাদের মধ্যে কিছু উদ্বেগ রয়েছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান আমাদের চেয়ে বেশি দিন টিকতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে তিনি হয়তো ঠিকই বলেছেন।
এফআর