অন্ধকার রাত, জামিল হেঁটে বাড়ি ফিরছেন। এর মধ্যে অন্ধকার চোখ সওয়া হয়ে এসেছে। কী যেন একটা বস্তু পায়ের স্পর্শ পেল, সঙ্গে শিশুর কান্না। তাকিয়ে দেখেন, একটা ছেঁড়া কাঁথা দিয়ে মোড়ানো একটি বাচ্চা। চারদিকে তাকিয়ে জামিল কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না। এভাবে ফেলে চলে যাওয়া মনুষ্যত্বের কাজ হবে না। সেখানে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন জামিল। উচ্চস্বরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন, কারও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। বাচ্চাটি ততক্ষণে কান্না বন্ধ করেছে। বড় মায়া লাগছে রেখে যেতে। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ভাবেন, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায়? বাড়ি যাই বাচ্চাটাকে নিয়ে, যা হওয়ার পরে হবে। ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্ত্রীকে ডাকলেন, ‘কই গো, ফরহাদের মা।’ বিলকিস স্বামীর ডাকে এগিয়ে এলেন, ভ্রু কুঁচকে বলেন, ‘তোমার হাতে কী?’
বাড়ি ফেরার পথে কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চাটাকে দেখতে পেলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আশপাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। বাচ্চাটা একা ফেলে আসি কী করে। তাই বাচ্চাটাকে সঙ্গে নিয়ে এলাম।
বিলকিস বলেন, ‘আপনি আবার কেন ঝামেলায় পড়তে গেলেন?’ জামিল বলেন, ‘জনমানবহীন রাস্তায় বাচ্চাটাকে ফেলে আসি কী করে! মায়াও হলো।’ বিলকিস ততক্ষণে বাচ্চাটাকে কোলে নিলেন। জামিল বলেন, ‘বাচ্চাটাকে কী খেতে দেওয়া যায়।’ বিলকিস আশ্বস্ত করেন, ‘আমি ব্যবস্থা করছি। ঘরে দুধ জাল দেওয়া আছে, তাতেই হবে। আপনি সকালে উঠে দেখবেন বাচ্চাটার কাউকে খুঁজে পান কি না। খোঁজাখুঁজি করলে পেতেও পারেন।’ জামিল বলল, ‘ঠিক আছে দেখব।’
ফজরের নামাজ শেষে জামিল আহমেদ বাইরে তাকালেন। ভোরের সূর্যোদয়ের সোনালি আলোয় চারপাশ উদ্ভাসিত। তিনি আশপাশে খোঁজাখুঁজি করলেন, কে এই শিশুটিকে রেখে গেছে জানার জন্য। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারল না। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, ‘সবই আল্লাহর ইচ্ছা। এই শিশু যখন আমার হাতে এসে পড়েছে, তখন এর লালন-পালনের দায়িত্বও আমারই।’ জামিল শিশুটির নাম রাখলেন নোমান।
একদিন ফরহাদ অভিমান করে বলল, ‘বাবা, তোমরা সবসময় নোমানকে নিয়েই ব্যস্ত থাক। আমাকে আদর করো না!’ বিলকিস ফরহাদকে কাছে টেনে নিয়ে আদর করে বললেন, ‘ওরে বাবা, তোমাকেও তো আদর করি। নোমান ছোট, তাই ওকে একটু বেশি যত্ন নিই।’
নোমানের বয়স এখন বারো। সে প্রায়ই বাবার ওষুধের দোকানে বসে। কিন্তু জামিল আহমেদ নোমানকে বসতে দেন না। ‘বাবা, তুমি স্কুলে যাবে, পড়াশোনা করবে।’ নোমান জিদ ধরে বলে, ‘কিন্তু বাবা, আমি তো স্কুলে যাই! শুধু অবসর সময়ে এখানে বসি। তুমি একা একা সব কাজ করবে, আমি বসে থাকব।’
জামিল স্নেহভরে নোমানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘পাগল ছেলে! এত ছোট বয়সে তোমার দোকানে বসতে হবে না।’ ছেলে ফরহাদও দোকানে আসে। দুই ছেলেকে জামিল বলেন, ‘ফরহাদ, নোমান, তোমরা দুজন এখন বাড়ি যাও। গিয়ে পড়তে বসো। যাওয়ার সময় ছেলেদের হাতে টাকা দিয়ে বলেন, পথে কিছু কিনে খাবে।’ ফরহাদ আর নোমান বাবার কথামতো বাড়ি ফিরে পড়তে বসে।
জামিল আহমেদ গুরুতর জ্বরে শয্যাশায়ী। নোমান সারারাত বাবার সেবা করে, মাথায় পানি ঢালে, তেল মালিশ করে। জামিল স্নেহভরে বলেন, ‘ওরে আমার বাবা, তুমি এবার ঘুমাও।’
সকালে নোমান দৃঢ়ভাবে বলে, ‘বাবা, আজ আমি দোকানে বসব।’
জামিল আপত্তি করলেও নোমান জিদ করে বাবার কাছ থেকে চাবি নেয়। সে দোকানে বসে। দুপুরে খাবারের কথা ভুলে যায়। জামিল দুর্বল শরীরে দোকানে এসে বলেন, ‘বাবা, তুমি এখন খেতে যাও।’
এদিকে ফরহাদ বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি করে। রুবেলকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় রুবেল পাথরের ওপর পরে মুখ আর নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। সেখানেই রুবেল মারা যায়। নোমান সেখান দিয়েই বাড়ি ফিরছিল। ঘটনাস্থলে নোমান এসে দেখে ফরহাদ ভয় পেয়ে কান্না করে। কান্না দেখে নোমান বলে, ‘ভাইয়া তুমি বলবা এই ধাক্কা তুমি দাওনি। আমার কথা বলবা, আমি দিয়েছি।’ ফরহাদ বলে নোমানকে, পরে তুই অস্বীকার করবি না তো? ‘না ভাইয়া।’
এদিকে রুবেলের মা-বাবাকে ডেকে আনে অন্যরা। এসে মৃত ছেলেকে দেখে, তারা কান্নাকাটি করেন। সেখানে বেশ হইচই পড়ে যায়। নোমান বলে, ‘ভাইয়া এখান থেকে চলে যাও। কেউ তোমার সঙ্গে কথা বললে বলবা, তুমি এখানে ছিলাই না। আমার কথা বলবা, আমি রুবেলকে ধাক্কা মেরেছি।’ নোমানের কথামতো ফরহাদ চলে যায়। ফরহাদ চলে গেলে নোমান নিজেই দায় স্বীকার করে। রুবেলের মা-বাবা কান্নাকাটি করতে থাকেন। পুলিশ এলে নোমান বলে, ‘আমিই ধাক্কা দিয়েছি।’
জামিল-বিলকিস ঘটনা শুনে স্তম্ভিত। বিলকিস ক্রোধে বলেন, ‘রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে! এই বয়সেই খুনি!’ নোমান মায়ের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে মা, ‘তুমি যে আমার মা।’ বিলকিস বলে, ‘আমি কোনো খুনির মা না।’
জামিল দুই হাত দিয়ে দুই কান টিপে ধরে বলেন, ‘আমি মানতে পারছি না! আমার ছেলে নোমান এই কাজ করতে পারে না।’ নোমানকে পুলিশ নিয়ে যায়।
এদিকে ফরহাদের অনুপস্থিতিতে বাড়িতে আতঙ্ক ছড়ায়। বিলকিস ভয়ে কাঁপতে থাকেন, আমার ছেলেকেও কি খুন করল? নইলে ফরহাদ বাড়ি ফিরছে না কেন?
জামিল নোমানের পক্ষে তদবির করতে চাইলে বিলকিস রাগে ফেটে পড়েন, ‘খুনিকে সাহায্য করতে যাবে না! ওর জন্য কোনো চেষ্টা করবে না!’ এক ছেলে জেলে, অন্য ছেলে নিখোঁজ! এই চিন্তায় জামিল অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অবশেষে ফরহাদ বাড়ি ফিরলে বিলকিস তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘যাক বাবা, তুমি ফিরে এলে! তোমার কিছু হয়নি তো?’ জামিল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেন, বড় ছেলে ফিরেছে... যদি ছোটটাও এভাবে ফিরে আসত!
বিলকিস স্বামীকে থামিয়ে দেন, ওই খুনির কথা বলো না! ফরহাদ নীরব থাকে, সত্য গোপন করে। জেলখানায় নোমান ভাবে, ‘ভাইয়ের কিছু হলে মা-বাবা কষ্ট পেত... সবাই ভালো থাক।’