জ্ঞানের দীনতা আমার মনে

আমিনুল ইসলাম

সাহিত্য

আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে নানা আয়োজন মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, খেলাধুলার সাথি, সাঁতারের সঙ্গী, রাখাল-বন্ধু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সতীর্থ, প্রেমিকা, সহকর্মী, জীবনসঙ্গী, সন্তান,

2026-03-06T10:58:04+00:00
2026-03-06T10:58:04+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
জ্ঞানের দীনতা আমার মনে
আমিনুল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ১০:৫৮ এএম 
ফাইল ছবি
আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে নানা আয়োজন মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, খেলাধুলার সাথি, সাঁতারের সঙ্গী, রাখাল-বন্ধু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সতীর্থ, প্রেমিকা, সহকর্মী, জীবনসঙ্গী, সন্তান, হিতাকাক্সক্ষী, প্রতিদ্বন্দ্বী এবং এমন আরও কত জন! আর আছে প্রকৃতি সঙ্গে নিয়ে আকাশ-বাতাস-সমুদ্র-নদী-বনভূমি-সূর্য-তারা-গ্রহ-চাঁদ এবং অসংখ্য পশুপ্রাণী। এদের কারোর সঙ্গই গুরুত্বহীন নয়; কারও অবদানই খাটো নয়। মানুষের কাছে মানুষের সঙ্গ এর সঙ্গে তো অন্য কোনো কিছুরই তুলনা চলে না। আমার জীবনে মানুষের পরে তিনটি বিষয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রেখেছে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত।

প্রকৃতির অজস্র উপাদান-উপকরণের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় ও সবচেয়ে নিবিড় সঙ্গী হচ্ছে নদী; আর মানব সৃষ্ট সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিবিড় ও নিত্যসঙ্গী হচ্ছে বই এবং সংগীত।

বই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যাখ্যা তো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মনীষী দিয়েছেন। একজন মানুষের জন্য এই ছোট পৃথিবী অনেক বড় একটি স্থান। আর মহাবিশ্ব তো বিরাট যেকোনো মানদণ্ডে। কিন্তু মানুষ ইচ্ছা করলেও তার একজীবনে সমগ্র পৃথিবী অথবা তার অর্ধেকও পরিভ্রমণ করে দেখতে পারে না। কজনের সুযোগ হয় সমুদ্র বা মাঝ-সমুদ্র দর্শনের? কজনের সুযোগ হয় নায়াগ্রা জলপ্রপাত বা আফ্রিকার বনভূমি দেখার? কজন দেখেছে পিরামিড/তাজমহল/ আইফেল টাওয়ার/ চীনের মহাপ্রাচীর/অজন্তা-ইলোরা-খাজুরাহো/ সাহারা মরুভূমি/হিমালয় পর্বত/ নীল নদ/ আমাজন নদী/ সাইবেরিয়া হিমভূমি! এক পৃথিবীতে কত ভাষাভাষী মানুষের বসবাস! কত ধর্ম-বর্ণ-আকৃতির মানুষের বসবাস! কত সভ্যতা! কত সংস্কৃতি! কত কীর্তি! কত ধ্বংস! কত ইতিহাস! কত কিংবদন্তি! কোনো মানুষের পক্ষেই সশরীরে এতকিছু দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু বই পড়ে ঘরে বসেই পৃথিবীর অনেক কিছু দেখা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথের ‘ঐকতান’ কবিতায় আমরা এমত ভাবনার চমৎকার কাব্যরূপ দেখি
‘বিপুলা এ পৃথিবীরে কতটুকু জানি!
দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী
মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,
কত না অজানা জীব, কত না অপরিচিত তরু
রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন
মন মোর জুড়ে থাকে অতি ক্ষুদ্র তারি এক কোণ।
সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণ বৃত্তান্ত আছে যাহে
অক্ষয় উৎসাহে-
যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী
কুড়াইয়া আনি।
জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে
পূরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষলব্ধ ধনে।’

যুক্তি আসতে পারে, বর্তমানে বিশ্ব একটি বিশ্বায়িত পাড়ায় পরিণত হয়েছে, প্রযুক্তির বদৌলতে পৃথিবীর যেকোনো দেশের নদ-নদী, রাজধানী, শহর-গ্রাম, মানুষজন এবং মহাবিশ্বের দৃশ্যমান সবকিছুই ঘরে বসেই দেখা যায়। ইন্টারনেটে ক্লিক করলেই যেকোনো বিখ্যাত লেখকের লেখনী স্ক্রিনে ভেসে ওঠে এবং তাৎক্ষণিকভাবেই পড়ে নেওয়া যায়। তা হলে বইয়ের আর প্রয়োজন কি? এবং বই মেলারই বা দরকার কোথায়? আসলে বই হচ্ছে জ্ঞানগৃহের মতো। বাকি সবকিছু বড়জোর জ্ঞানের হোটেল, রেস্ট হাউস অথবা পর্যটন মোটেল মাত্র। গৃহের কোনো বিকল্প হয় না; বিকল্প নেই বইয়েরও। একটি সমৃদ্ধ পারিবারিক বুকসেলফের দিকে চোখ পড়লে যে অনির্বচনীয় আনন্দ পাওয়া যায়, একটি বই নাকের কাছে নিলে সেখান থেকে যে জ্ঞান-গন্ধ  ছিটকে এসে মননকে মাতোয়ার করে দেয়, কারও কাছ থেকে একখানা উৎকৃষ্ট বই উপহার পেলে প্রাণে যে তৃপ্তি সঞ্চারিত হয়, তা ইন্টারনেটে লেখা বা বই পড়ে পাওয়া যাবে না। আর একটি কথা। মানুষ হচ্ছে সবচেয়ে জটিল প্রাণী। তার মনস্তত্ত্ব কখনো সাগরের মতো গভীর, কখনো আকাশের মতো সীমাহীন, কখনো আমাজনের জঙ্গলের মতো দুর্ভেদ্য। এই মানুষের গভীর-নিবিড়-গহন অন্তর্দেশে আলো ফেলে আর কিছু নয়,  তেমন মানের কোনো বই। শেক্সপিয়ারের বইগুলোতে মানুষের মন ও চরিত্রকে যতখানি উন্মোচিত করা হয়েছে, তা তো বই ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। ইমতিয়াজ মাহমুদের একটি কবিতা মনে পড়ছে
‘খোদা আমাকে মানুষ বানাল।
আমি হতে চেয়েছিলাম বই।
বাংলা বই। লাল মলাট।
মোমের আলোয় বালকেরা
আমাকে গলা ছেড়ে পাঠ করত।
বাংলা বই। মোমের আলোয়।
খোদা আমাকে মানুষ বানাল।
কেউ পড়তে পারে না!’

এই দুষ্পাঠ্য মানুষকেও কিছুটা পাঠ করা যায় এবং তার প্রকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে বই। তাই পুরোনো কথার পুনরাবৃত্তি করে বলতে হয়, জ্ঞান হচ্ছে শক্তি। বই হচ্ছে সম্মিলিত জ্ঞানের উৎস। গ্রন্থাগার হচ্ছে বইয়ের উৎস। আর বইমেলা হচ্ছে একই সঙ্গে বইয়ের উৎস ও উৎসব। দীর্ঘদিন বইমেলা। পৃথিবীর আর কোথাও এত দীর্ঘ বইমেলা হয় না। বাংলাদেশের একুশে বইমেলার আরেকটি বিরল ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি একই সঙ্গে প্রকাশক, লেখক, বই ক্রেতা এবং দর্শনার্থীদের দীর্ঘতম মিলনমেলা।

পৃথিবীর আর কোনো বইমেলায় উল্লিখিত পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের সম্মেলন ও সম্মিলন ঘটে না। ঈদ, পূজো, বড়দিন, পহেলা বৈশাখ, থার্টি ফার্স্ট জানুয়ারি এবং এ ধরনের আরও যেসব উৎসব হয়, কোনো উৎসবই এত দীর্ঘ সময় ধরে হয় না এবং কোনো উৎসবেই একুশে বইমেলার এই ‘মহামিলন’ ঘটে না। হয়তোবা সে কারণেই সুদূর আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশ থেকে পথের কষ্ট ও ক্লান্তি এবং আর্থিক ব্যয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে ছুটে আসেন বইপ্রেমী মানুষরা যোগ দিতে এই মহামিলনে। এই বইমেলায় প্রতি বছর আনুষ্ঠানিক ও সপ্রমাণ আত্মপ্রকাশ ঘটে ডজন ডজন নতুন লেখকের। তারা তাদের জীবনের প্রথম বইটি এই মহামিলনের মঞ্চেই প্রকাশ ও প্রচার করে থাকেন। দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে আসে বইপ্রেমী ও লিখিয়ে অসংখ্য যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী এবং বয়োজ্যেষ্ঠ নর-নারী। শিশুরাও বাদ থাকে না। তাই তো তাদের জন্য সপ্তাহে একটা দিন বিশেষভাবে বরাদ্দ করা হয়।

বাংলা একাডেমির আয়োজনে প্রতিদিন অনুষ্ঠিত হয় সাহিত্যবিষয়ক সেমিনার/ আলোচনা/ আবৃত্তি এবং অপরিহার্যভাবেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফলে বইমেলা কেবল বই কেনাবেচাতে সীমায়িত থাকে না। এটি একই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক চর্চা ও অগ্রগতি সাধনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। প্রত্যাশিতভাবেই এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ও উৎসবের উদ্বোধন ঘটে দেশের সরকারপ্রধানের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রধান আতিথ্যে। মেলায় বাড়তি গুরুত্ব যোগ করে  মাঝেমধ্যে নোবলবিজয়ী অমর্ত্য সেন কিংবা শঙ্খ ঘোষের মতো কবিগণও উপস্থিত থাকেন উদ্বোধন পর্বে। মেলা শুরুর এক দিন আগে থেকেই দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রচার করে নিত্যদিনের বইমেলার হাল-হকিকত। টেলিভিশনগুলো খবরের অংশ হিসেবে প্রায়শ লাইভ টেলিকাস্ট করে মেলার অংশবিশেষ।

একুশের বইমেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। বছরের নব্বইভাগ বই প্রকাশিত হয়ে আসছে বইমেলাকে কেন্দ্র করে। প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে জড়িত এই বইমেলা। একটা সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ বিদেশি বইয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল; এতে করে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যেত। একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সব শ্রেণির পাঠকের জন্য নানা ধরনের যথেষ্ট সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়। এতে করে পাঠকের বিদেশি বইমুখী অভ্যাস ও প্রয়োজন দুয়েরই মোড় ঘুরে গেছে। লেখক ও পাঠক তৈরিতে একুশে বইমেলার ভূমিকা আঁতুড়ঘরের সমান।

বিগত কয়েক বছর ধরে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা বইমেলায় এসে, থেকে এবং চলাফেলা করে এক ধরনের বাড়তি স্বাচ্ছন্দ্য পাচ্ছেন। এটি ঠিক যে বইমেলায় যারা আসছেন, তাদের অধিকাংশই শুধু ঘুরতে আসছেন, বই কেনেন না। তথাপি তারও একটি ইতিবাচক প্রভাব আছে। বই দেখতে দেখতেই তারা কিনতে শিখবেন, পড়তে শিখবেন। বই কেনার পরিকল্পনা করে না এলেও অনেকেই বই দেখতে দেখতে একটা-দুটো কিনে ফেলবেন। এভাবে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হতে হতে একসময় অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। বইমেলা হচ্ছে সেই  জানাশোনার এবং জানাশোনার পথ ধরে বইয়ের প্রেমে পড়ার বৃন্দাবন। যতই নেতিবাচক কথাবার্তা উচ্চারিত হোক, এটিই সত্য  যে, দেশে বইয়ের পাঠক ছিলেন, আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন। আর সে কারণেই যতদিন যাচ্ছে তত বাড়ছে প্রকাশকের সংখ্যা, তত বাড়ছে বইয়ের সংখ্যা, লেখকের সংখ্যা। এটি শুভ ধারাবাহিকতা। 

সত্যি সত্যি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হলে মানুষকে বেশি বেশি বই পড়তে হবে এবং বইমেলাকে কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে জেলা-উপজেলায়। আমরা সেদিনের দিকে তাকিয়ে আছি যেদিন শিশু-বালকের কণ্ঠে বইমেলা হয়ে উঠবে আনন্দের সেøাগান: ‘বইমেলা বইমেলা/ এ মেলায় বই মেলা/ মোটা কিংবা চটি বই/ ছবি কিংবা কবির বই/ জ্ঞানের বই ধ্যানের বই/ পড়ার বই ছড়ার বই/ যেখানে ছড়ার বই/ সেখানেই রই রই/ এই নিয়ে জমে আছে মেলা/ এই মাসে ভুলে আছি খেলা।’


  বিষয়:   সাহিত্য  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: