ইরানের শাহেদ ড্রোন কীভাবে ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ নাম পেলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচ, সহজ উৎপাদন এবং

2026-03-06T12:45:53+00:00
2026-03-06T12:45:53+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরানের শাহেদ ড্রোন কীভাবে ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ নাম পেলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম 
শাহেদ ড্রোন। সংগৃহীত ছবি
ইরানে তৈরি ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। তুলনামূলক কম খরচ, সহজ উৎপাদন এবং দীর্ঘপাল্লার আক্রমণ সক্ষমতার কারণে এই ড্রোনগুলোকে অনেক সামরিক বিশ্লেষক ‘গরিবের ক্রুজ মিসাইল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যাপক ব্যবহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সামরিক কৌশলে অন্তর্ভুক্তির ফলে এ ড্রোন বিশ্ব রাজনীতিতেও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানি শাহেদ ড্রোনের উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে এই ড্রোনের সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে ‘শাহেদ-১৩৬’ নামের কামিকাজে বা ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক’ ড্রোনটি দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় এটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

প্রথম নজরে শাহেদ ড্রোন খুব আধুনিক বা জটিল প্রযুক্তির মনে না হলেও এর কার্যকারিতা লুকিয়ে আছে এর কৌশলগত ব্যবহারে। এটি ছোট আকারের, ধীরগতির এবং তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছায়। ফলে অনেক সময় উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এগুলো শনাক্ত করা বা প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শাহেদ ড্রোনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিপুল সংখ্যা। এগুলো খুব দ্রুত এবং কম খরচে উৎপাদন করা যায়। ফলে একসঙ্গে বহু ড্রোন আকাশে পাঠিয়ে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়। এই কৌশলকে অনেক সময় ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ঝাঁক আক্রমণ বলা হয়।

যখন একই সময়ে অনেকগুলো ড্রোন আকাশে পাঠানো হয়, তখন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু আলাদা করে ধ্বংস করতে হয়। এতে প্রতিপক্ষের অত্যন্ত ব্যয়বহুল মিসাইল ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি শাহেদ-১৩৬ ড্রোন তৈরির খরচ সাধারণত ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের মধ্যে। এর বিপরীতে একটি ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইলের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। আবার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দামও কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

এই বিশাল ব্যয়ের পার্থক্যের কারণে ইরানের মতো দেশের জন্য শাহেদ ড্রোন অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং উন্নত অস্ত্র কেনার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইরান তুলনামূলক কম খরচে বড় পরিসরের আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতে শত শত ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে এবং এর মধ্যে কিছু ড্রোন তাদের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে। এসব হামলায় বন্দর, বিমানবন্দর, হোটেল এবং ডেটা সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশল কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি সৃষ্টি করা নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া। যুদ্ধের শুরুতে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে দেওয়া হয়, যাতে পরবর্তীতে ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইল দিয়ে বড় ধরনের আক্রমণ চালানো সহজ হয়।

শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২১ সালের দিকে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময় এটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। সেই সময় রাশিয়া ইরানের কাছ থেকে সরবরাহ পাওয়া ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়।

এরপর রাশিয়া নিজস্ব কারখানায় ইরানের নকশার ভিত্তিতে এ ধরনের ড্রোন উৎপাদন শুরু করে। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর ব্যবহার আরও বাড়তে থাকে।


সাম্প্রতিক সময়ে ড্রোনটির বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কথাও জানা গেছে। নতুন সংস্করণগুলোতে জ্যামিং প্রতিরোধী অ্যান্টেনা, উন্নত নেভিগেশন ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধী প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। এগুলো সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে এবং উন্নত সংস্করণ প্রায় ১২০০ মাইল পর্যন্ত উড়তে সক্ষম।

যেহেতু ড্রোন এখন আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তাই এগুলো ঠেকানোর জন্যও নতুন নতুন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে। অনেক দেশ এখন ইলেকট্রনিক জ্যামিং, স্বল্পপাল্লার মিসাইল, যুদ্ধবিমান এবং লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।

বিশেষ করে লেজারভিত্তিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন ধ্বংস করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কারণ একটি লেজার শটের খরচ প্রচলিত মিসাইলের তুলনায় অনেক কম।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় আকারের ড্রোন হামলা দ্রুত প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা এখনও অনেক দেশেরই সীমিত। বিশেষ করে যদি একসঙ্গে বহু দিক থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ড্রোন হামলা চালানো হয়, তাহলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে কম খরচের কামিকাজে ড্রোন আরও বড় ভূমিকা পালন করবে। এবং শাহেদ-১৩৬ এর মতো ড্রোন আধুনিক যুদ্ধের কৌশল ও সামরিক ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।



/ইউএমএইচ



  বিষয়:   ইরান  ইসরায়েল  সংঘাত  শাহেদ ড্রোন 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: