ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নতুন ধরনের প্রচারণা শুরু করেছে হোয়াইট হাউস। প্রচলিত প্রেস ব্রিফিং বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বদলে যুদ্ধকে তুলে ধরা হচ্ছে মিম, ভিডিও গেম এবং হলিউড সিনেমার দৃশ্যের মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওগুলোতে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে অনেকটা অ্যাকশন সিনেমা বা ভিডিও গেমের স্টাইলে। এসব ভিডিওতে ব্যবহার করা হচ্ছে জনপ্রিয় গেম কল অব ডিউটির ধাঁচ, আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে স্পঞ্জবব, আয়রন ম্যান বা অন্যান্য হলিউড চলচ্চিত্রের দৃশ্যের অংশ।
হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের এক্স, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত এসব ভিডিও ইতিমধ্যে কোটি কোটিবার দেখা হয়েছে। ভিডিওগুলোর অনেকগুলোতেই দ্রুতগতির সংগীত, বিস্ফোরণের দৃশ্য এবং পপ কালচারের নানা রেফারেন্স ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি তুলে ধরা হয়েছে।
এই প্রচারণা ঘিরে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তার মতে, বাস্তব যুদ্ধকে ভিডিও গেম বা বিনোদনের মতো করে উপস্থাপন করা হলে তা সংঘাতের ভয়াবহতা আড়াল করে এবং যুদ্ধকে এক ধরনের ‘গেমিফিকেশন’-এ পরিণত করে। তাদের মতে, যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করার বদলে এই প্রচারণা মূলত যুদ্ধকে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় করে তুলতেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের একটি ভিডিও শুরু হয় জনপ্রিয় ভিডিও গেম ‘কল অব ডিউটি’র একটি দৃশ্য দিয়ে। এরপর দ্রুত দেখা যায় বিমানবাহী রণতরী থেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করছে, আকাশে ছুটে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র এবং লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরণ ঘটছে। এই দৃশ্যগুলোর সঙ্গে বাজছে র্যাপার চাইল্ডিশ গ্যামবিনোর গান ‘বনফায়ার’। ভিডিওতে একজন গভীর কণ্ঠের বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধে জিতছি।’ প্রতিটি বিস্ফোরণের পর ভিডিও গেমের মতো একটি ‘কিল স্কোর’ দেখানো হয়, যেখানে শত্রু ধ্বংস করার জন্য পয়েন্ট দেওয়া হয়। এই ভিডিও ইতিমধ্যে প্রায় ৫৮ মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা : রয়টার্স বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের ভিডিও ব্যবহার করে ইরানে তাদের সামরিক অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। আগের অনেক যুদ্ধের সময় সরকার সাধারণত চার্ট, বিশ্লেষণ বা আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে তথ্য দিত। কিন্তু এবার সেই জায়গা অনেকটা দখল করেছে ভিডিও গেমের মতো স্টাইলের প্রচারণা।
ভিডিওগুলোতে দেখা যায় স্টেলথ বিমান মেঘের ভেতর দিয়ে উড়ছে, লক্ষ্যবস্তুতে বিস্ফোরণ ঘটছে এবং পুরো দৃশ্যটি অনেকটা হলিউড সিনেমার মতো করে উপস্থাপন করা হয়েছে। আগের প্রশাসনগুলো সাধারণত যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতেই প্রচারণা চালাত। কিন্তু এবার মূলত দেখানো হচ্ছে কীভাবে যুদ্ধ চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি কতটা শক্তিশালী।
পপ কালচার ও সিনেমার ব্যবহার : এই ভিডিওগুলো প্রকাশ করা হয়েছে এক্স, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে পপ কালচারের বিভিন্ন রেফারেন্স, অ্যাকশন সিনেমার দৃশ্য এবং দ্রুতগতির সংগীত। একটি ভিডিওতে দেখা যায় সুপারম্যান, ব্রেভহার্ট, টপ গান, আয়রন ম্যান এবং গ্ল্যাডিয়েটর সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গে যুদ্ধের বিস্ফোরণের ফুটেজ একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধরনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং ট্রাম্প সমর্থক অনেক অ্যাকাউন্ট সেগুলো শেয়ার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য : ডিজিটাল বিভ্রান্তি নিয়ে কাজ করা গবেষক ক্রেইগ সিলভারম্যান বলেন, আগে এই ধরনের ভিডিও বানাতে অনেক সময় ও দক্ষতা লাগত। কিন্তু এখন আধুনিক ডিজিটাল টুলের কারণে খুব দ্রুতই এ ধরনের ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। তার ভাষায়, ‘এখন হোয়াইট হাউসের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার আধা ঘণ্টা সময় পেলেই বেশ ভালো মানের ভিডিও বানিয়ে ফেলতে পারেন।’
সমালোচনা ও বিতর্ক : তবে অনেক সমালোচক বলছেন, এই ভিডিওগুলো একটি গুরুতর যুদ্ধকে ভিডিও গেমের মতো করে দেখাচ্ছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায় স্পঞ্জবব স্কয়ারপ্যান্টস চরিত্রটি বারবার বলছে, ‘আবার দেখব?’ এর মাঝেই যুদ্ধের বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখানো হয়। ১৪ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি এক্স এবং টিকটকে ৯ মিলিয়নের বেশিবার দেখা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই ধরনের ভিডিও যুদ্ধের বাস্তবতা আড়াল করে এবং এটিকে এক ধরনের বিনোদনে পরিণত করে।
স্টক ফুটেজ ব্যবহারের অভিযোগ : রয়টার্স আরও জানিয়েছে, কিছু ভিডিওতে বর্তমান যুদ্ধের নয় এমন পুরোনো ফুটেজও ব্যবহার করা হয়েছে। ৩ মার্চ প্রকাশিত একটি টিকটক ভিডিওর নাম ছিল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, যা ইরান অভিযানের জন্য প্রশাসনের দেওয়া নাম। ৩৮ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে বি-১ বোমারু বিমান, বি-২ স্টেলথ বোমারু এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের দৃশ্য দেখানো হয়। রয়টার্স যাচাই করে দেখেছে, এর কিছু ফুটেজ পুরোনো এবং বর্তমান যুদ্ধের নয়।
সামরিক বাহিনীর ভিন্ন সুর : এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা অনেক বেশি সংযত ভাষায় যুদ্ধের বিষয়টি তুলে ধরছেন। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সম্প্রতি যুদ্ধের সময় নিহত ছয় মার্কিন সেনার মধ্যে চারজনের নাম প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, নিহত সেনাদের জন্য তার গভীর শোক রয়েছে এবং তাদের পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমবেদনা জানান। তার ভাষায়, ‘আমরা তাদের পরিবারের সঙ্গে শোক ভাগ করে নিচ্ছি।’
তরুণদের লক্ষ্য করে প্রচারণা : বিশ্লেষকদের মতে, এই ভিডিওগুলোর প্রধান লক্ষ্য হতে পারে তরুণ পুরুষরা। হোয়াইট হাউসের সাবেক যোগাযোগ কর্মকর্তা ক্রিস্টোফার পারসেল বলেন, ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন মাসের পর মাস যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করেছিল। কিন্তু এখন ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভিডিও বানিয়ে সেটিকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করছে। তিনি এটিকে সরাসরি ‘যুদ্ধের গেমিফিকেশন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, ‘এটা করার পদ্ধতি সত্যিই অদ্ভুত।’
ট্রাম্পের সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বার্তা ছড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ দক্ষ। তবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জন এফ কেনেডি স্কুলের অধ্যাপক ম্যাথিউ বাউম বলেন, এখানে একটি বড় সমস্যা রয়েছে। কারণ ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক সংঘাত থেকে দূরে রাখার কথা বলেছিলেন। ফলে তার সমর্থকদের একটি অংশ ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধকে পুরোপুরি সমর্থন না-ও করতে পারে। বাউম বলেন, ‘ট্রাম্পের সমর্থকরা সাধারণত তাকে অনুসরণ করেন। কিন্তু ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে তার নিজের ঘাঁটিতেই কিছু দ্বিধা রয়েছে।’