অমর একুশে গ্রন্থমেলার শুরু থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়ে প্রাণবন্ত। তবে এর ভিন্ন চিত্র দেখা যায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে, যেখানে পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। এ যেন একই মেলার দুই প্রান্তে দুই ভিন্ন দৃশ্য।
বইমেলার আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমির সীমা পেরিয়ে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছড়িয়ে পড়ে মেলা। এরপর থেকে ধীরে ধীরে মেলার প্রধান আকর্ষণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠেছে।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন থাকায় বেলা ১১টা থেকে শুরু হয়েছে বইমেলা। সকালে শিশুপ্রহরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান শিশু-কিশোরদের পদচারণে মুখরিত হয়ে উঠেছিল। মা-বাবার হাত ধরে শিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছিল বিভিন্ন স্টলে স্টলে। সেই সঙ্গে সবচেয়ে ভিড় লক্ষ্য করা যায় ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’ নামক স্টলে যেখানে পুতুল নাচ, হ্যান্ড পাপেট আর বায়োস্কোপকে ঘিরে শিশুদের আনন্দের শেষ নেই।
অন্যদিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে দেখা যায় একেবারেই ভিন্ন চিত্র। এখানে নেই তেমন পাঠক-দর্শকদের সমাগম। বিভিন্ন স্টলের বিক্রেতারা বসে বসে অবসর সময় পার করছেন। দুয়েকজন পাঠক দর্শক এলেও কাউকে বই কিনতে দেখা যায়নি।
এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশ নিয়েছে ৫৪৯টি প্রতিষ্ঠান। একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের স্টল। এখানে অংশ নিয়েছে ৮১টি প্রতিষ্ঠান।
সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের স্টল রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে। এখানে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৬৮টি। বইমেলার আয়োজকদের মতে, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ মূলত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রকাশনা প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য বরাদ্দ। এখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেয়। মেলার সেমিনার ও সাংস্কৃতিক আয়োজনও সাধারণত এই প্রাঙ্গণেই অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকে। পাশাপাশি এখানে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর ও খাবারের স্টলও বসে।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে কথা হয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তুলনায় আমাদের এখানে পাঠকের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। যেই দুয়েকজন আসে তাদের অধিকাংশই ঘুরে চলে যায়।
ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইসলামী ফাউন্ডেশনের স্টলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছরই আমরা এই বইমেলা প্রাঙ্গণে স্টল বরাদ্দ পাই। এখানে খুব একটা পাঠক আসে না।
রাজধানীর উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা আশিকুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, সকাল থেকেই বাচ্চাদের নিয়ে বইমেলায় এসেছি। এ বছর বইমেলায় অন্যবারের চেয়ে তুলনামূলক দর্শনার্থী কম। এতে সাচ্ছন্দ্যে ঘুরতেও পারছি, দেখে দেখে বইও কিনতে পারছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামিয়া আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, সাধারণত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তেমন যাওয়া হয় না। এ বছর একবার গিয়েছিলাম মাত্র। কেননা সেখানে যে ধরনের বই পাওয়া যায় সেগুলো বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত। তাই খুব একটা আগ্রহ জাগে না।
বাতিঘর প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আরমান হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের বেচাকেনা সকাল থেকে ভালো চলছে। সাধারণত শিশুরা নানা ছবিযুক্ত বইগুলো বেশি পছন্দ করছে।
গতকাল শনিবার ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার দশম দিন এবং মেলার সময়সূচি বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় ছিল শিশুপ্রহর। গতকাল তথ্যকেন্দ্রে মেলার নতুন বই জমা পড়েছে ১৮৫টি।
শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা : অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে গতকাল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
মূলমঞ্চ : বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় জন্মশতবর্ষ : নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইসরাইল খান। আলোচনায় অংশ নেন সোহরাব হাসান। সভাপতিত্ব করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী।
লেখক বলছি : লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন মুস্তাফা মজিদ।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান : বিকাল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন মিনহাজুল হক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন সাহিদা পারভীন রেখা, আনজুমান আরা এবং আজহারুল ইসলাম রনি। সংগীত পরিবেশন করেন ফেরদৌস আরা, পিয়াল হাসান, নিশাত আহমেদ, মো. ইউসুফ আহমেদ খান, জয় শাহরিয়ার, নির্ঝর চৌধুরী এবং মো. শফিউদ্দিন।
আজকের আয়োজন : আজ রোববার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে আসাদ চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন কুদরত-ই-হুদা। আলোচনায় অংশ নেবেন সৈকত হাবিব। সভাপতিত্ব করবেন সৈয়দ আজিজুল হক। বিকাল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।