ফিতরার সম্পদ গরিবের অধিকার

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

ইসলাম

ইসলামে রমজান ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসজুড়ে মুসলমানরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা

2026-03-08T13:07:46+00:00
2026-03-08T13:07:46+00:00
 
  শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬,
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
ফিতরার সম্পদ গরিবের অধিকার
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১:০৭ পিএম 
প্রতীকী ছবি
ইসলামে রমজান ইবাদত, সংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসজুড়ে মুসলমানরা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে এবং নিজেদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত করার চেষ্টা করে। রমজানের শেষে ঈদুল ফিতরের আনন্দ আসে, যা মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে রোজাদারদের জন্য এক পুরস্কারস্বরূপ। কিন্তু ইসলাম এই আনন্দকে কেবল ধনী বা সচ্ছল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না, বরং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যেও যেন ঈদের আনন্দ সমানভাবে পৌঁছে যায় সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করেছে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই ইসলামে সদকাতুল ফিতর বা ফিতরার বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই ফিতরা শুধু একটি দান নয়, বরং এটি রোজার পূর্ণতা দানকারী এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। 

ফিতরা মূলত রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে আদায় করা একটি বাধ্যতামূলক দান। ইসলামের বিভিন্ন ফিকহি মত অনুযায়ী এটি ওয়াজিব বা ফরজসদৃশ একটি ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের খাদ্যের ব্যবস্থা হয়, অন্যদিকে রোজাদারদের ইবাদতের ঘাটতি পূরণ হয়। ইসলাম মানবজীবনের আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। ফিতরা সেই সামাজিক দায়িত্বেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের বারবার দান-সদকার প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং দরিদ্র মানুষের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সালাত কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো’ (সুরা বাকারা : ৪৩)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার রয়েছে’ (সুরা জারিয়াত : ১৯)। এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ইসলাম সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং দরিদ্র মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। সদকাতুল ফিতর এই নীতিরই একটি বাস্তব প্রয়োগ। 


হাদিসে ফিতরার বিধান ও গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন, সে স্বাধীন হোক বা দাস, পুরুষ হোক বা নারী, ছোট হোক বা বড়। তিনি এক ‘সা’ খেজুর অথবা এক ‘সা’ যব পরিমাণ ফিতরা নির্ধারণ করেছেন এবং ঈদের নামাজের আগে তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫০৩)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে ফিতরা সমাজের প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক এবং এটি ঈদের নামাজের আগেই আদায় করা উচিত।
ফিতরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো রোজার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে যাওয়া ভুলত্রুটি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করা। মানুষের রোজা পালনকালে কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় কথা, অসাবধানতা বা ছোটখাটো ভুল হয়ে যেতে পারে। এসব ত্রুটি থেকে রোজাকে পবিত্র করার একটি মাধ্যম হিসেবে ফিতরা নির্ধারণ করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাদারকে অশ্লীল ও অনর্থক কথাবার্তা থেকে পবিত্র করার জন্য এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে এটি আদায় করে তা গ্রহণযোগ্য সদকা, আর যে ব্যক্তি নামাজের পরে আদায় করে তা সাধারণ দানের মতো হয়ে যায়’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)। ফিতরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। 

ইসলাম এমন একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যেখানে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অযথা বৈষম্য থাকবে না। ঈদের দিনটি মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও উৎসবের দিন। কিন্তু যদি সমাজের একটি বড় অংশ অভাব-অনটনের কারণে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় তা হলে ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য পূর্ণতা পায় না। ফিতরার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের কাছে খাদ্য ও অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে তারাও ঈদের দিন আনন্দের সঙ্গে অংশ নিতে পারে। এ ছাড়া ফিতরা মুসলমানদের মধ্যে মানবিকতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়। রমজান মাসে মুসলমানরা ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করে, যা তাদের দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। সেই উপলব্ধি থেকেই তারা দরিদ্র মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ফিতরা এই সহমর্মিতাকে একটি নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেয় এবং সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে। 

ইসলামের সামাজিক ব্যবস্থায় ধনী মানুষের সম্পদের মধ্যে দরিদ্র মানুষের অধিকার নির্ধারিত রয়েছে। ফিতরা সেই অধিকার বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, বরং একটি সামাজিক দায়িত্বও। ফিতরার মাধ্যমে সমাজে সম্পদের একটি অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, ফলে সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। সবকিছু বিবেচনা করলে দেখা যায়, ফিতরা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক বিধান। এটি একদিকে রোজাদারের ইবাদতকে পূর্ণতা দেয়, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। ইসলামের ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সহমর্মিতার যে শিক্ষা রয়েছে, ফিতরা তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন। তাই প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত ঈদের আগে যথাযথভাবে ফিতরা আদায় করা এবং এই ইবাদতের মাধ্যমে সমাজে মানবিকতা ও সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। 

সময়ের আলো/এনএ 


  বিষয়:   ফিতরার সম্পদ  গরিবের অধিকার 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: