কাজ সমান হলেও মজুরিতে অর্ধেক

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে সকাল হলেই মাঠের দিকে পা বাড়ান অসংখ্য নারী। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি ক্ষেত

2026-03-08T13:26:52+00:00
2026-03-08T16:10:46+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কাজ সমান হলেও মজুরিতে অর্ধেক
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ১:২৬ পিএম  আপডেট: ০৮.০৩.২০২৬ ৪:১০ পিএম
গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে ফসলের মাঠে কাজ করা অসংখ্য নারী শ্রমিকের বাস্তবতা এখনো সেই পুরোনো বৈষম্যের গল্পই বলে। ছবি : সময়ের আলো
উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে সকাল হলেই মাঠের দিকে পা বাড়ান অসংখ্য নারী। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি ক্ষেত পরিচর্যা, ফসল কাটা কিংবা ঝাড়াই-মাড়াই- কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই তাদের পরিশ্রম জড়িয়ে আছে। কিন্তু মাঠের এই শ্রমের হিসাব কষতে গেলে দেখা যায় এক অদ্ভুত বৈষম্যের চিত্র। পুরুষ শ্রমিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলেও নারী শ্রমিকদের মজুরি প্রায় অর্ধেক। আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে এলেই নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন ও সমতার কথা নতুন করে আলোচনায় আসে। কিন্তু উত্তরের কৃষিপ্রধান জেলা গাইবান্ধার গ্রামীণ জনপদে মাঠে কাজ করা অসংখ্য নারী শ্রমিকের বাস্তবতা এখনও সেই পুরোনো বৈষম্যের গল্পই বলে। 

বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আহসানুল হাবিব সাঈদ মনে করেন, কৃষি নীতিমালায় নারীর শ্রমকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, নারীদের জন্য আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ, জমির মালিকানা এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা গেলে তারা আরও বেশি উৎপাদনে অবদান রাখতে পারবেন। 

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী বলেন, নারী কৃষি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য শুধু সামাজিক অবিচার নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। তার মতে, কৃষি শ্রমিকদের জন্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। 


স্থানীয় নারী নেত্রী ইশরাত জাহান লিপি জানান, মাঠ পর্যায়ে ঘুরে তিনি বহু জায়গায় দেখেছেন নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি সময় কাজ করেন। কিন্তু মজুরি পান অর্ধেক বা তারও কম। তিনি মনে করেন, সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত উদ্যোগ নেওয়া ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা কঠিন। 

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, গাইবান্ধা জেলায় কৃষি শ্রমের প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে নারীদের কাছ থেকে। কৃষি খাতে তাদের এই অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত না করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও নারী উন্নয়ন দুটোই পিছিয়ে পড়বে। 

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কামদিয়া ইউনিয়নের একটি বোরো ধানের ক্ষেতে দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে কাজ করছিলেন কয়েকজন নারী শ্রমিক। তাদের মধ্যে ছিলেন ফুলমনি হেমব্রম, বাসন্তী মুর্মু, চন্দনা সোরেন, লুকি কিসকু ও সরোজিনী হাঁসদা। ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে কথা বলতেই উঠে আসে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথা। ফুলমনি হেমব্রম বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা ধানক্ষেতে কাজ করি। পুরুষরা যেখানে ৭০০ টাকা পায়, আমরা পাই ৩৫০ টাকা। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু কাজ না করলে তো ঘরে চুলা জ্বলবে না। একই অভিযোগ করেন সরোজিনী হাঁসদা। তার কথায়, মাঠে নারী-পুরুষ সমান কাজ করি। অনেক সময় আমরা বেশি কাজ করি। কিন্তু মজুরি পাই অর্ধেক। মজুরি বাড়ানোর কথা বললে মালিকরা বলে, কাল থেকে আর আসতে হবে না। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যখন নারী-পুরুষ সমতার কথা বলা হচ্ছে, তখন এই কথাগুলো যেন গ্রামীণ বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। কথাগুলো কেবল কয়েকজন নারীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং গাইবান্ধার গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় একজন পুরুষ কৃষি শ্রমিক দৈনিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পান। একই ধরনের কাজের জন্য একজন নারী শ্রমিককে দেওয়া হয় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। অর্থাৎ একই শ্রমের মূল্য নির্ধারণে নারী শ্রমিকদের জন্য একটি অদৃশ্য সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়েছে। কৃষিপ্রধান এ জেলার অর্থনীতিতে নারীর অবদান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজার ১৮৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলায় চারটি পৌরসভা ও ৮১টি ইউনিয়নে মোট গ্রাম রয়েছে ১ হাজার ২৪৪টি। জেলার জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ ৬২ হাজার ২৩২ জন। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৬ শতাংশ নারী। জেলায় মোট পরিবার রয়েছে ৬ লাখ ১১ হাজার ২৮৩টি, যার প্রায় ৯৮ শতাংশই কৃষিনির্ভর। জেলার মোট কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৬ লাখ ১ হাজার ৭২১টি। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ প্রান্তিক কৃষক, ৩১ শতাংশ ক্ষুদ্র কৃষক, ২০ শতাংশ ভূমিহীন কৃষক, ৯ শতাংশ মাঝারি কৃষক এবং মাত্র ২ শতাংশ বড় কৃষক। বর্গাচাষি পরিবারের সংখ্যা রয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। কৃষি বিভাগের তালিকাভুক্ত কৃষি শ্রমিক রয়েছেন প্রায় ৫৫ হাজার ৬৫০ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ শ্রমশক্তির একটি বড় অংশই নারী। 

গ্রামীণ কৃষিকাজে নারীর ভূমিকা শুধু মাঠের কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। ধান, পাট, গম ও শাকসবজি চাষের পাশাপাশি তারা পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পেও যুক্ত। পরিবারে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী এখন নিজেরাই ক্ষুদ্র খামার পরিচালনা করছেন এবং কৃষিকাজকে প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। তবু বাস্তবতায় দেখা যায়, এই বিপুল শ্রমের বেশিরভাগই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় না। অনেক ক্ষেত্রে নারীর কাজকে পারিবারিক শ্রম হিসেবে দেখা হয়। ফলে তাদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় না, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে থাকেন। 

একইসঙ্গে জমির মালিকানা, ঋণ সুবিধা, প্রশিক্ষণ কিংবা সরকারি কৃষি সহায়তার ক্ষেত্রেও তারা তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত।
গ্রামীণ এলাকায় সরেজমিন কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ নারী কৃষি শ্রমিকের নিজের কোনো জমি নেই। তারা দিনমজুর হিসেবেই কৃষিকাজ করেন। আধুনিক কৃষি পদ্ধতি বা প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগও খুব সীমিত। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে গেলে জমি জামানত হিসেবে দিতে হয়, যা অধিকাংশ নারীর পক্ষেই সম্ভব নয়।
কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের সংস্পর্শেও নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকেন। কিন্তু তাদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। কৃষি শ্রমের বড় অংশই অসংগঠিত খাত হওয়ায় অধিকাংশ নারী শ্রমিক কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা বা সরকারি প্রণোদনার আওতাতেও আসতে পারেন না। 

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যখন নারীর সমতা ও ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, তখন গাইবান্ধার মাঠে কাজ করা ফুলমনি বা সরোজিনীদের গল্প আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে-কবে মিলবে সমান শ্রমের সমান মূল্য? কৃষিতে নারীর শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা শুধু তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন নয়, বরং দেশের কৃষি উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্যও অপরিহার্য। 
 
সময়ের আলো/এনএ 


  বিষয়:   কাজ সমান  মজুরি অর্ধেক 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: