নদীতে মাছ নেই, চলে না নৌকা

রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ

সারাদেশ

নদীবেষ্টিত জেলা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। প্রধান নদী যমুনাসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদী একসময় ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘদিনের খরা

2026-03-09T02:29:55+00:00
2026-03-09T02:29:55+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
সারাদেশ
সিরাজগঞ্জে কাজ হারিয়ে দিশাহারা নদীনির্ভর মানুষ
নদীতে মাছ নেই, চলে না নৌকা
রানা আহমেদ, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ২:২৯ এএম   (ভিজিট : ১২৯)
সিরাজগঞ্জে নাব্যতা হ্রাস, ভরাটসহ নানা কারণে নদীগুলো হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। ছবি : সময়ের আলো
নদীবেষ্টিত জেলা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। প্রধান নদী যমুনাসহ জেলার বিভিন্ন নদ-নদী একসময় ছিল এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘদিনের খরা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসসহ নদী ভরাট এবং শাখা নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নদীগুলো হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। এতে একদিকে নদীতে মাছ ধরা বন্ধের উপক্রম হয়েছে, অন্যদিকে জেলে ও নৌ-শ্রমিকসহ নদীনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা পড়েছে হুমকির মুখে। নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় শুধু জেলে কিংবা নৌ-শ্রমিকরাই নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী খনন ও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বিশাল এক জনগোষ্ঠী স্থায়ীভাবে জীবিকা হারাবে। এ কারণে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন ও খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, শুষ্ক মৌসুমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন কমে গেছে যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মৎস্যজীবীদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের জন্য ভিজিএফ কার্ড প্রদানের লক্ষ্যে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং দ্রুত তাদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান বলেন, নদী খনন ও নাব্যতার বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএর আওতাধীন। তারাই এ ব্যাপারে কী করণীয় বলতে পারবে। আমরা শুধু ভাঙনের বিষয়টি দেখি।

সিরাজগঞ্জ বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম-পরিচালক ক্যাপ্টেন জি. এ. এম. আলী রেজা বলেন, অনেক স্থানে ড্রেজিংয়ের কাজ করা হয়েছে। নদীতে পানি বৃদ্ধি পেলে জেলার অনেক জায়গায় খননের কাজ শুরু করা হবে।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যমুনার বুকজুড়ে জেগে ওঠা হাজার হাজার একর জমিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছেন। উৎপাদন বাড়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটলেও চরম বিপাকে পড়েছেন নৌ-শ্রমিক ও জেলেরা। একসময় ভরা নদীতে নৌকা চালিয়ে ও মাছ ধরে যারা সংসার চালাতেন, তারা এখন কাজ হারিয়ে দিশাহারা। নদীতে পানি না থাকায় অনেকেই তাদের শেষ সম্বল নৌকা ও জাল বিক্রি করে দিয়েছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। জীবন বাঁচাতে পৈতৃক পেশা ছেড়ে অনেকেই কাজের সন্ধানে শহরসহ ঢাকামুখী হয়েছে। শহর ও ঢাকায় গিয়ে কেউ রিকশা-ভ্যান, কেউ সিএনজি, গার্মেন্টস, ট্রাক-বাসের হেলপার, আবার কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় যমুনা, ইছামতী, হুরাসাগর, বাঙালি, বড়াল, করতোয়া, ফুলজোরসহ প্রায় ১৩টি উল্লেখযোগ্য নদী রয়েছে। এসব নদীর বেশিরভাগই যমুনা নদীর শাখা বা উপনদী হিসেবে পরিচিত। জেলায় স্থায়ী মৎস্যজীবীর সংখ্যা ২৬ হাজার ৮৭৩ জন। এ ছাড়া মৌসুমি মৎস্যজীবী রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদী এবং তাড়াশ ও উল্লাপাড়ায় চলনবিলে একসময় এসব নদীতে সারা বছর পানি প্রবাহ থাকলেও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পলি জমে বর্তমানে অনেক নদী ও খালের বিভিন্ন অংশে চর জেগে উঠেছে। কোথাও কোথাও নদ-নদী, খাল-বিল প্রায় শুকিয়ে গেছে। এ কারণে অনেক স্থানে কৃষকরা বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করছে।

কাজিপুরের জেলে নিমাই দাস বলেন, আগে প্রতিদিন নদীতে নামলে ভালো মাছ পাওয়া যেত। এখন সারা দিন জাল ফেলেও তেমন মাছ পাওয়া যায় না। নদীতে অনেক চর জেগে ওঠায় মাছের দেখা মিলছে না। সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। আরেক জেলে রহিম উদ্দিন বলেন, নদীতে পানি কমে গেছে, খালগুলোও শুকিয়ে যাচ্ছে। মাছ না থাকায় অনেকেই পেশা বদল করে অন্য জেলায় চলে গেছেন। কাওয়াকোলা চরের জেলে মালেক শেখ বলেন, নদীতে চর পড়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করা ছাড়া উপায় নেই।

এদিকে নৌ-শ্রমিকদের অবস্থাও একই রকম। নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়ায় অনেক নৌপথে নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বহু মাঝি ও নৌ-শ্রমিক। স্থানীয় মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলার প্রধান নদী যমুনা ও তার শাখা নদীগুলোতে পানি কমে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছি। দীর্ঘদিনের খরা ও নদীর নাব্যতা হ্রাসের অনেক জায়গায় চর পড়েছে। এ কারণে নদীপথে নৌকা চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। নৌ-শ্রমিক আব্দুল করিম বলেন, আগে নৌকায় চরের মানুষ ও মালামাল পরিবহন করেই সংসার চলত। এখন নদীতে পানি না থাকায় নৌকা চালানোই যায় না। শুষ্ক মৌসুম আসার আগেই নদী শুকিয়ে যায়। কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।

চৌহালী উপজেলা থেকে অগণিত মানুষ দৈনিক জেলা শহরে যাতায়াত করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করতে যায়। কিন্তু জেগে ওঠা ডুবো চরের কারণে নদী পার হতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে তাদের কর্মঘণ্টা।

এনায়েতপুর নৌকা ঘাটের ইজারাদার ইউসুফ আলী জানান, যেভাবে নদীর পানি কমছে, তাতে নৌকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন ড্রেজিং করে নৌপথ তৈরি করা না হলে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এতে জেলা সদরের সঙ্গে নৌপথে চৌহালীসহ বিভিন্ন স্থানের যাবতীয় কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে।

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   সিরাজগঞ্জ  দিশাহারা  নদীনির্ভর মানুষ  নদী  মাছ  নৌকা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: