চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল জঙ্গল সলিমপুরে অপরাধীদের আস্তানা ও অবৈধ সাম্রাজ্য নির্মূল করতে যৌথ বাহিনীর বিশাল এক সাঁড়াশি অভিযান চলছে।
সোমবার (৯ মার্চ) ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছে।
অভিযানের বিষয়ে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. রাসেল জানান, সোমবার সকাল ৬টার দিকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেন। এরপর শুরু হয় সুনির্দিষ্ট আস্তানাগুলোতে তল্লাশি।
তিনি বলেন, যৌথ বাহিনীর চার হাজার সদস্য এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। অভিযানের বিস্তারিত ফলাফল এবং কোনো উদ্ধার বা আটকের তথ্য থাকলে তা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সীতাকুণ্ডের এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকাটি অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। তবে গত জানুয়ারি মাসে এখানে অভিযানে গিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হামলায় এক র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এলাকাটি নতুন করে আলোচনায় আসে।
ওই ঘটনার পর থেকেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখানে বড় ধরনের সমন্বিত অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তৎকালীন সময়ে অভিযানটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবেই আজকের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ।
চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই এলাকাটি এক হাজার ২৫৬ একর পাহাড়ি ভূমি জুড়ে বিস্তৃত। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে অপরাধীরা এখানে তাদের নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলেছে।
জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, জঙ্গল লতিফপুর ও জঙ্গল সলিমপুরসহ পাঁচটি মৌজার প্রায় তিন হাজার ৭০ একর খাস জমি বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের দখলে রয়েছে, যার প্রায় ৩০ শতাংশই পাহাড়ি এলাকা।
অভিযোগ রয়েছে, মো. ইয়াসিন এবং রোকনউদ্দিনের নেতৃত্বে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ এই বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।
স্থানীয়দের কাছে ইয়াসিন ‘রাজা’ হিসেবে পরিচিত। গত দুই দশকে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে প্লট তৈরি এবং সরকারি জমি দখল করে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
২০২২ সালের ১৯ জুলাই কোতোয়ালি এলাকা থেকে পুলিশ ইয়াসিনকে গ্রেফতার করলেও তার বাহিনী এখনও সক্রিয়। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখা এবং স্থানীয়দের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
এই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিতই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত বছরের ৪ অক্টোবর এখানে একজনকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর পরদিন এই সংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিকও সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলার শিকার হন।
বর্তমানে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাহাড়ের গভীরে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছেন। অপরাধীদের আস্তানাগুলো চিরতরে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এফআর