চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অভিযানের খবরে সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে একটি কালভার্ট ভেঙে দেয়, রাস্তার ওপর ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেয় এবং একটি স্থানে নালার স্ল্যাব তুলে ফেলে। ফলে ভোরে অভিযান শুরু হলে বিভিন্ন স্থানে বাধার সম্মুখীন হয় যৌথ বাহিনী।
সোমবার (৯ মার্চ) ভোর থেকে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির সমন্বয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এই অভিযান শুরু হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের তথ্য আগেই সন্ত্রাসীদের কাছে পৌঁছে যায়। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি যাতে ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য আলীনগর এলাকায় প্রবেশের প্রধান সড়কে ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করা হয় এবং একটি কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়।
পরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্টের অংশ ইট-বালু দিয়ে ভরাট করে বিকল্প পথ তৈরি করে ভেতরে প্রবেশ করেন।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান জানান, জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূল ও আলীনগর নামে দুটি গ্রাম রয়েছে। ছিন্নমূল পেরিয়ে আলীনগরে ঢোকার আগেই ট্রাক দিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়েছিল। সেটি সরিয়ে সামনে এগোতে গিয়ে দেখা যায় একটি কালভার্ট রাতের বেলা ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে তা অস্থায়ীভাবে ভরাট করে যৌথ বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করে।
তিনি আরও বলেন, এটি বড় ধরনের অভিযান। এলাকায় যারা প্রভাব বিস্তার করে তাদের সিএনজি চালকসহ বিভিন্ন ধরনের সোর্স রয়েছে। কোনোভাবে হয়ত তারা আগেই অভিযানের খবর পেয়ে গেছে। তবে অভিযান এখনও চলমান রয়েছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন।
অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথেই বসানো হয় তল্লাশি চৌকি, যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে। বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অভিযান পরিচালনা করছেন।
তা ছাড়া জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। অভিযান চলাকালে যেন সন্ত্রাসীরা পাহাড় থেকে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য হেলিকপ্টার থেকে নজরদারি রাখা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে জঙ্গল সলিমপুরে হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এবারই প্রথম হেলিকপ্টার ব্যবহার হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযানের সময় সাংবাদিকদের জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন।
ইয়াসিন চলতি বছরের জানুয়ারিতে অভিযানে গিয়ে নিহত র্যাব কর্মকর্তার হত্যা মামলার প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় তার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত চার দশকে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে।
গত বছরের অক্টোবরে জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন ও রোকন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ইয়াসিন অতীতে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সীতাকুণ্ডের সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী দাবি করে আসছেন।
যদিও র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার ঘটনার পর আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নয়।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) মো. রাসেল বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। এটি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে অবস্থিত। প্রশাসনিক ভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও নগরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছেন। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দাপটে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরকে অনেকেই ‘দেশের ভেতর আরেক রাজ্য’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।
এফআর