‘সন্ত্রাসীদের আখড়া’ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালিয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। এমনটাই দাবি করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ।
সোমবার (৯ মার্চ) দুপুর ২টার পর অভিযান নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই দাবি করেন তিনি। অভিযানকালে মোট ১৫ জনের মতো আটক হয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল অস্ত্র উদ্ধার করার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, এখানে মানুষ নানাভাবে নিপীড়িত নির্যাতিত ছিল এবং এখানে এক ধরনের চক্র কাজ করেছিল। যারা সরকারকে পাশ কাটিয়ে, সরকারের প্রচলিত রীতি নীতি পাশ কাটিয়ে, এসি ল্যান্ডকে পাশ কাটিয়ে তারা নিজেরাই জমির কাগজ তৈরি এবং জমির হস্তান্তর কার্যক্রম পরিচালনা করত।
তিনি আরও বলেন, এমনই একটা অবস্থা ছিল যে, সাধারণ মানুষ এখানে ঢুকতে পারত না। বিশেষ করে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখানে ঢুকতে ভয় পেত অনেক সময়। এবার পঞ্চমবারের মত এই ব্যবস্থা। এর আগে আরো চারবার এখানে আসবার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি আমরা। তবে আজ অভিযান সফল হয়েছে।
ডিআইজি হাবীব পলাশ বলেন, এবার আমরা সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে, যৌথভাবে- আমাদের পুলিশের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব আর জেলা প্রশাসনের বিরাট একটি অংশ সবাই মিলে এবার আমরা সফল হয়েছি বলে মনে করছি। এই জায়গার উপর আমাদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরে এখন থেকে পুলিশ ও র্যাবের দুইটি ক্যাম্প থাকবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এছাড়া পরবর্তীতেও পুলিশ যেন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে এজন্য বিভাগীয় কমিশনারকে অনুরোধ করেছেন ডিআইজি হাবীব পলাশ।
অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এখানে যেহেতু নেটওয়ার্কের সমস্যা, তাই এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে সেটি আমরা এখনো জানতে পারিনি।
জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। একটি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন।
ইয়াসিন চলতি বছরের জানুয়ারিতে অভিযানে গিয়ে নিহত র্যাব কর্মকর্তার হত্যা মামলার প্রধান আসামি। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় তার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত চার দশকে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে।
গত বছরের অক্টোবরে জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন ও রোকন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
উল্লেখ্য, গত জানুয়ারিতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭ এর উপ-সহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভুঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি ও শিল্পাঞ্চল) মো. রাসেল বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকা নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। এটি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে অবস্থিত। প্রশাসনিক ভাবে এটি সীতাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও নগরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের অধিকাংশই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছেন। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দাপটে দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরকে অনেকেই ‘দেশের ভেতর আরেক রাজ্য’ বলে উল্লেখ করে থাকেন।
এফআর