মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র করেনি বরং বিশ্বরাজনীতিকে তার ‘ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক ধারার মধ্যে টেনে এনেছে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ধরনের পররাষ্ট্রনীতি ও ক্ষমতার প্রদর্শনের প্রতিফলন, যার প্রভাব পড়ছে ইউরোপ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক রাজনীতির ওপর। সবমিলে বিশ্বের কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে।
জোট উপেক্ষা করে যুদ্ধের সূচনা : বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করেনি। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের সময় যেমন আন্তর্জাতিক জোট ও কূটনৈতিক বৈধতা অর্জনের চেষ্টা ছিল, এবার তা প্রায় অনুপস্থিত বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল মিলে আকস্মিকভাবে হামলা শুরু করে। এমনকি তাদের অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশও আগে থেকে কিছু জানত না।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ইতালির একজন শীর্ষ প্রতিরক্ষামন্ত্রী তখন দুবাই সফরে ছিলেন কিন্তু হামলা শুরুর বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। একজন মার্কিন কর্মকর্তার ভাষায়, এটি মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের ‘মৌলিক অভাব’ প্রকাশ করে।
যুদ্ধের ধাক্কায় অস্থির বিশ্ব : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি হত্যার শিকার হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত অস্থির হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রাথমিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেটি তারা শুরু করেনি এবং অনেকেই চায়ওনি। যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়া নাগরিকদের উদ্ধারে বিভিন্ন দেশ তৎপর হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় দুর্বল অর্থনীতিগুলো চাপের মুখে পড়ে। উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নড়বড়ে হয়ে যায়। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত : সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের চূড়ান্ত ফলাফল এখনও অনুমান করা কঠিন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লাগাতার বিমান হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমে যেতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে বলে দাবি করতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে ঝুঁকিও রয়েছে। যদি ইরানের সরকার পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তা হলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ, শরণার্থী সংকট বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি : এই যুদ্ধকে বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
এই নীতির মূল ধারণা হলো প্রয়োজনে একতরফাভাবে শক্তি প্রয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ধারা, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা, শক্তির প্রদর্শন এবং প্রচলিত কৌশলগত কাঠামোকে উপেক্ষা করা এই যুদ্ধের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অনির্দেশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প এখন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম অস্থির প্রভাবক হয়ে উঠেছেন।
ইউরোপের দ্বিধা ও কৌশল : ইউরোপীয় দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে জটিল অবস্থায় পড়েছে। তারা একদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও বজায় রাখতে বাধ্য। একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, অনেক দেশ এখন ‘শান্ত থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বিব্রত না করা’র কৌশল নিচ্ছে। কারণ অতিরিক্ত বিরোধিতা করলে তা উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ এখন এমন এক অবস্থায় আছে যেখানে তারা ট্রাম্পকে পুরোপুরি সমর্থনও করতে পারে না, আবার তাকে ছাড়াও চলতে পারে না।
উপসাগরে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া : যুদ্ধের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। কাতারে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং হুরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দেয়। মার্কিন প্রশাসন নাকি ইরানের পাল্টা হামলার মাত্রা পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি; এমন মন্তব্যও উঠে এসেছে বিশ্লেষণে।
মিত্রদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ : উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, ওয়াশিংটনের বক্তব্য অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক।
তাদের মতে, যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য কী; তা এখনও স্পষ্ট নয়। এদিকে কাতারের আমির ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে সংকট নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, অঞ্চলটি এখন ‘বিপজ্জনক মোড়ের’ মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে আশঙ্কা : ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। নতুন নেতৃত্বের অধীনে সরকার টিকে থাকলেও হয়তো নিয়মিত সামরিক চাপ বজায় রাখতে হবে।
অন্যদিকে যদি রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা অনেক সময় এমন; প্রথমে পুরোনো কাঠামো ভেঙে দেওয়া, তারপর পরিস্থিতি যেদিকে যায় সেদিকেই নিজের বিজয় ঘোষণা করা।
বদলে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি : সিএনএনের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। এটি শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয় বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এখন এমন এক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, যার নীতি প্রায়ই অনির্দেশ্য। ফলে ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের আলো/এআর