যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই সংকট নিয়ে অনেক ভুল তথ্যও ছড়াচ্ছে। এমনকি ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম গোর্ক পর্যন্ত ভুলভাবে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে একটি আগুনের ভিডিওকে তেল আবিবের ঘটনা বলে দাবি করেছিল।
আরেকটি ভিডিও, যা আসলে ২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের কাছে একটি অগ্নিকাণ্ডের, সেটিকে ইরানের তেলক্ষেত্রের আগুন বলে প্রচার করা হয়। একই সময় ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক পোস্ট করে কখনো ইরানে গণঅভ্যুত্থানের আহ্বান জানাচ্ছেন, কখনো দেশটির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করছেন, আবার কখনো দাবি করছেন যে তিনি সরাসরি ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনেও ভূমিকা রাখবেন। এমনকি তিনি বলেছেন, সাবেক ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা ইরানি জনগণের জন্য ‘দেশ ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ’।
কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটা ঘটেছে। বোমাবর্ষণের মাঝেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে খামেনির শোক পালন করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে। কিন্তু এই ঘটনা হয়তো তাদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত ফলও বয়ে আনতে পারে। আধুনিক ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা বিরল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই হত্যাকাণ্ড বরং ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে এবং ইরানি বিপ্লবের চেতনা আবারও জাগিয়ে তুলতে পারে।
ইরানের রেড লাইন : ইসলামী প্রজাতন্ত্র যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন তারা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করতে সক্ষম; এটা বহুবার দেখা গেছে। তবে খামেনি ছিলেন তুলনামূলক বাস্তববাদী নেতা। তার সময়ে ইরানের বহু শীর্ষ জেনারেল ও পারমাণবিক বিজ্ঞানী হত্যার শিকার হয়েছেন, কিন্তু ইরান সবসময় প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। যখন প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তা ছিল হিসাব করে নেওয়া এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার মতো। খামেনির নেতৃত্বে ইরান কয়েকটি স্পষ্ট
সীমারেখা মেনে চলত : গালফ অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সরাসরি আক্রমণ না করা এবং হুরমুজ প্রণালি বন্ধ না করা। তবে এর ব্যতিক্রমও ঘটেছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলায় সাময়িকভাবে আরামকোর তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে। যদিও এই হামলার দায় স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়নি; ইয়েমেনের হুথিরা দায় নিয়েছিল, ফলে ইরানের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্পষ্টই থেকে যায়। একইভাবে ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত হলেও ইরান সরাসরি বড় ধরনের প্রতিশোধ নেয়নি। আবার ইসরাইল যখন কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে, কিংবা প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন- তখনও ইরান বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু করেনি।
বিপ্লবী চেতনা : খামেনির ইরান বিপ্লবী আবেগের চেয়ে হিসাব-নিকাশে বেশি গুরুত্ব দিত। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। অনেকের মতে, এতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবী চেতনা আবারও শক্তিশালী হয়েছে। মাত্র দশ দিনের মধ্যে ইরান হুরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বড়ভাবে ব্যাহত করেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে এমন এক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের চেয়েও বড় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে; যা ১৯৭৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে হওয়া সব তেল সংকটের সম্মিলিত ক্ষতির সমান।
এদিকে ইরানের হামলায় কাতারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আগাম সতর্কীকরণ রাডার সিস্টেম গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার দাম ছিল প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার। এই রাডার ছাড়া অঞ্চলটির থাড ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকভাবে কাজ করা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র এখন দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থাপিত কিছু প্যাট্রিয়ট সিস্টেম খুলে এনে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পূরণ করার চেষ্টা করছে। একই সময়ে ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরান মানামা, কুয়েত সিটি, দুবাই, দোহা ও রিয়াদের মতো শহরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিমান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
বৈশ্বিক সংকট : এই যুদ্ধ এখন শুধু আঞ্চলিক সংঘাত নয়; ধীরে ধীরে এটি বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১৪টি দেশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সাইপ্রাসসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। নরওয়ে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি কিংবা দূতাবাসের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের রাজনীতিক আলি লারিজানি আগেই বলেছিলেন, তারা এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে যাতে ‘আমেরিকা ও জায়নবাদী শক্তি তাদের কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়’।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের জনগণের একটি বড় অংশ রাস্তায় নেমে নতুন নেতা হিসেবে তার ছেলে মুজতবা খামেনিকে সমর্থন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ইরানিদের সতর্ক করেছিল যেন তারা মুজতবাকে নেতা হিসেবে না বেছে নেয়। কিন্তু তাকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ইরানের শাসকগোষ্ঠী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে; তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না।
সংকট ঘনীভূত হচ্ছে : প্রতিদিন এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ফ্রান্স যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে, ব্রিটেন বিমানবাহী রণতরী প্রস্তুত করছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ অনেকটা হঠাৎ করেই নেওয়া হচ্ছে; এগুলোর জন্য আগাম কোনো পরিকল্পনা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লাগাতার বোমাবর্ষণে ইরান বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও দেশটি ভেঙে পড়েনি। বরং পাল্টা প্রতিরোধের সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির যে আবরণ এতদিন ধরে ছিল, সেটিও ভেঙে দিয়েছে। এতদিন অনেক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অংশে সীমাবদ্ধ থাকলেও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর দৈনন্দিন জীবন খুব বেশি বদলায়নি। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন; তারা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে।
যুদ্ধ জিততে হলে ট্রাম্পের দরকার ইরানের দ্রুত পতন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং ইরানের বেঁচে থাকার কৌশল কার্যকর হচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। তেলের বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা ক্রমেই বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এই চাপই হয়তো ট্রাম্পকে যুদ্ধ থামানোর দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে ততদিনে এই সংঘাত বহু দেশকে বিপর্যস্ত করতে পারে, তেলক্ষেত্র ধ্বংস হতে পারে এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাতে পারে।
এই পুরো সংকটের পেছনে মূলত দুই নেতার সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে; একজনের ব্যক্তিগত অহংকার এবং অন্যজনের আঞ্চলিক আধিপত্যের স্বপ্ন। ইউরোপের অনেক দেশ এ সময় প্রায় নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই নেতা হিসেবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নামই উচ্চারিত হচ্ছে।
মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ
সময়ের আলো/আআ