ভাঙা ডিপ বাজারের পাশের ছোট্ট সড়কটি তখন বিকালের আলোয় ধুলায় ঢেকে গেছে। উঠানে বসে কয়েকজন নারী গল্প করছিলেন। হঠাৎ একটি শিশু দৌঁড়ে সড়কের দিকে চলে গেলে তাকে বাঁচাতে ছুটে যান চার নারী। ঠিক সেই মুহূর্তে বিকট শব্দ তুলে দ্রুতগতিতে ছুটে আসে একটি ‘কাঁকড়া’। মুহূর্তের মধ্যে চাপা পড়ে যান তারা। শিশুটি অক্ষত থাকলেও গৃহবধূ মিনি বেগম ঘটনাস্থলেই মারা যান, আহত হন আরও চারজন। গাইবান্ধায় এমন ঘটনা নতুন নয়।
স্থানীয়দের ভাষায় ‘কাঁকড়া’ নামে পরিচিত ট্রাক্টর বা শ্যালো ইঞ্জিনচালিত এই যান এখন সড়কে আতঙ্কের নাম। বড় আকারের চাকা, উচ্চশব্দ আর দ্রুতগতির কারণে স্থানীয়রা এগুলোকে ‘কাঁকড়া’ নামে ডাকেন। অভিযোগ আছে, গত কয়েক বছরে এসব বাহনের চাকায় পিষ্ট হয়ে শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- যে যানকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), সেই বাহনই কীভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে? আরও বড় প্রশ্ন, কীভাবে সেই একই বাহন আবার ব্যবহৃত হচ্ছে সরকারি কাজেও?
বিআরটিএ বলছে, ‘কাঁকড়া’ নামে পরিচিত এসব যানবাহন মূলত কৃষিকাজের জন্য ব্যবহারের উপযোগী ট্রাক্টর বা শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান। এগুলো সড়কে চলাচলের জন্য অনুমোদিত নয়।
এ বিষয়ে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক কামাল আহমেদ বলেন, বৈধ যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড থাকে। যেমন আসন সংখ্যা, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, ব্রেকিং সিস্টেম, লোড বহনের ক্ষমতা, দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও কাঠামোগত নিরাপত্তা। এসব মানদণ্ড পূরণ করে বিআরটিএর অনুমোদন পেলে তবেই কোনো যান বৈধ হিসেবে গণ্য হয়। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী নসিমন, করিমন, ভটভটি কিংবা ‘কাঁকড়া’ সবই অবৈধ।
তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গাইবান্ধার বিভিন্ন সড়কে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দেখা যায় এসব যানের অবাধ চলাচল। ইটভাটা, পুকুর খনন কিংবা নির্মাণকাজে মাটি ও বালু বহনের প্রধান বাহন হয়ে উঠেছে এগুলো। শুধু চলাচলই নয়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজেও ব্যবহারের নজির রয়েছে এই বাহনের।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন কার, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক ও পিকআপসহ সাত শতাধিক যানবাহন অধিগ্রহণ বা রিকুইজিশন করে। এর পাশাপাশি প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী পুলিশ পাঁচ শতাধিক ‘কাঁকড়া’ সংগ্রহ করে নির্বাচনি সরঞ্জাম ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও ভোটের সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে ব্যবহার করে। নির্বাচনের আগের দিন এমন একটি যান দুর্ঘটনার কবলেও পড়ে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নের সোলাগাড়ি এলাকায় নির্বাচনি সরঞ্জাম বহনকারী একটি নসিমন খাদে পড়ে যায়। এতে তিনজন আনসার সদস্য আহত হন। যদিও খাদে পানি না থাকায় ব্যালট বাক্সসহ নির্বাচনি সামগ্রী অক্ষত ছিল।
অবৈধ ঘোষিত একটি যানবাহন নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রশাসনের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত। জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ভবিষ্যতে সরকার যে নির্দেশনা দেবে তা স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অমিতাভ দাশ বলেন, কৃষিকাজের জন্য আনা ট্রাক্টরকে পরিবর্তন করে মাটি, বালু ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে এই বাহন দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবুর মতে, বাস্তবতার কারণে যদি এই যানের প্রয়োজন থাকে, তবে এটিকে সড়ক উপযোগী করতে হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব যানের অধিকাংশ চালকই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই, নেই ড্রাইভিং লাইসেন্সও। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময় থেকেই যায়। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ট্রাক্টর ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত এই বাহনগুলো শুধু সড়কে চলাচলই করছে না, ভারী মালামাল বহনের কারণে দ্রুত নষ্ট করে দিচ্ছে গ্রামীণ সড়ক। বিশেষ করে পুকুর খননের মাটি কিংবা ইটভাটার বালু পরিবহনে ব্যবহার হওয়ায় সড়কের ওপর মাটির স্তর জমে থাকে। এতে বর্ষাকালে কাদা তৈরি হয়ে পথচারী ও মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রামচন্দ্রপুর এলাকার বাসিন্দা মিথুন বলেন, এই যান চললে পুরো এলাকা ধুলায় ঢেকে যায়। ধুলা বাতাসে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। শব্দদূষণও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিকট শব্দ তুলে ছুটে চলা এসব বাহনের কারণে আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভ্যানচালক ইউনুস আলীর প্রশ্ন, রিকশা বা ভ্যান চালাতেও লাইসেন্স লাগে, চালকের লাইসেন্স লাগে। তা হলে কাঁকড়া গাড়ি ও চালকের কোনো লাইসেন্স না থাকলেও সড়কে চলে কীভাবে?
মোটরসাইকেলচালক মিলন মিয়া বলেন, মোটরসাইকেলের কাগজপত্র না থাকলে পুলিশ মামলা দেয়।
স্থানীয়রা বলছেন, এসব যানবাহনের পেছনে একটি প্রভাবশালী চক্র রয়েছে। দুর্ঘটনার পর অনেক ক্ষেত্রেই মামলা না হয়ে আপস-মীমাংসা হয়ে যায়।
বিআরটিএ যাকে অবৈধ বলছে, সেই যানবাহন কীভাবে সড়কে অবাধে চলছে? আর কীভাবেই বা সেই একই বাহন নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে? গাইবান্ধার সড়কে ‘কাঁকড়া’ নিয়ে এই দ্বৈত বাস্তবতার উত্তর এখনও অমীমাংসিত।
সময়ের আলো/আআ