৭ মার্চ শনিবার বেলা সোয়া ৩টা। রাজধানীর কারওয়ান বাজার ব্যস্ত মোড়ে শতাধিক যানবাহন আর মানুষের জটলা। এরই মধ্যে ধীরগতিতে এগোতে থাকা একটি লোকাল বাসের জানালা ভেঙে মোবাইল ছিনিয়ে নেয় এক ছিনতাইকারী। শত শত মানুষের সামনে যানবাহনের ফাঁক গলে পালিয়ে যায় মোবাইল নিয়ে। শুধু বাসযাত্রীই নয়, বেপরোয়া এসব ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাজনৈতিক কর্মী, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এমনকি পুলিশ সদস্যরাও শিকার হচ্ছেন ছিনতাইয়ের।
একের পর এক অপ্রতিরোধ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে আতঙ্কের জন্ম দিচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক দিন পরই শুরু হচ্ছে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি। ফাঁকা বাসস্থানের নিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন শহরবাসীরা।
ঈদের ছুটিতে পরিবারসহ গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে যাবেন সরকারি চাকরিজীবী সাদেকুর রহমান। প্রতিবারের মতো এবারও তিনি উদ্বিগ্ন খালি বাসার নিরাপত্তা নিয়ে। জানালেন, মিরপুর-১ নম্বরে তার বাসা। পরিবারের সদস্যদের আগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। তিনি যাবেন ঈদের দুদিন আগে। কিন্তু খালি বাসার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উৎকণ্ঠিত। গত ঈদুল আজহার ছুটিতে তাদের ভবনের একটি খালি ফ্ল্যাটে রান্নাঘরের গ্রিল কেটে চুরির ঘটনা ঘটে। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া সাদেকুরের মতো উদ্বিগ্ন অনেকেই।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ মহল থেকে মাঠ পর্যায়ের পুলিশকে অধিক সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এবার ঈদে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন থাকবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে নগরবাসীকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় উৎকণ্ঠিত সাধারণ মানুষ। মতিঝিল এজিবি কলোনির বাসিন্দা সরকারি চাকরিজীবী সুমাইয়া নাহার জানান, ছিনতাইয়ের ভয়ে সন্তানদের নিয়ে রাতে মার্কেটে যেতে ভয় পান তিনি। নির্জন রাস্তায় ছিনতাইয়ের ভয়, মার্কেটে পকেটমার, অজ্ঞান পার্টিসহ দুর্বৃত্তদের ভয় সবসময় তাড়া করে ফেরে।
গত ৭ মার্চ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তারাবিহ নামাজ শেষে হাঁটাহাঁটি করার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক মোতাহার হোসেন। ছিনতাইকারী তার আইফোন, মানিব্যাগ ও হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় মোতাহার হোসেনের স্টাফ কর্মকর্তা জাবেদ হোসেন সজল পরদিন মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। পরে মোবাইল ফোন উদ্ধারসহ দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
এর দুদিন পরে গত ৯ মার্চ ভোরে নারায়ণগঞ্জ ছিনতাইয়ের শিকার হন শীতলক্ষ্যা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই লুৎফর রহমান। ছিনতাইকারীরা পুলিশের ব্যবহৃত গুলিভর্তি পিস্তলটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। যদিও পরবর্তী সময়ে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জে প্রকাশ্যে পুলিশের গুলিভর্তি পিস্তল ছিনতাইয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই গত মঙ্গলবার রাতে ছিনতাইয়ের শিকার হন এক এনসিপি নেতা। ঘটনার শিকার ইফতি এনসিপির সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির জেলা কমিটির সংগঠক। ছিনতাইয়ের এ তথ্যেও সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আব্দুল মান্নান।
ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো জনশূন্য হয়ে পড়ায় তালাবদ্ধ বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি বাড়ে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কূটনৈতিক এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক সমন্বিত বৈঠকে ঈদকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তা এবং ঈদে মানুষের ঘরে ফেরা নির্বিঘ্ন করতে করণীয় নির্ধারণে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানোর প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, শহর ও বন্দর এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের টহল জোরদার করা হবে। সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে অপরাধ প্রতিরোধে জনাকীর্ণ স্থানে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার আসন্ন ঈদে পুলিশের সতর্ক থাকার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, আসন্ন ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে হবে। ঈদে বেশিরভাগ মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাবে। এ সময়ে কোনো অপরাধ, ছিনতাই, মলম পার্টি বা অন্যান্য অপতৎপরতা সংঘটিত হতে না পারে সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলন কক্ষে ফেব্রুয়ারি-২০২৬ মাসের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় উপস্থিত ডিএমপির পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, শতভাগ সততা বজায় রেখে পুলিশ সদস্যদের তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে যাতে পুলিশের ভাবমূর্তি ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এবার ঈদে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হবে, যাতে যাত্রীদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল যাত্রা নিশ্চিত হয়।
ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার ভিড় বাড়ায় মার্কেট ও শপিং এলাকাগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব স্থানে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন থাকবে। বিশেষ করে নারী ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও র্যাবের টহল জোরদার করা হবে। বড় মার্কেটগুলোতে নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে মার্কেট মালিক সমিতিগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এসব প্রসঙ্গে বলেন, ঈদ যাত্রাকালে সময়ে গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ, কমলাপুর এবং সদরঘাট এই প্রধান বাস ও লঞ্চ টার্মিনালগুলোতে ডিএমপির বিশেষ নজরদারি ও তদারকি বাড়ানো হবে। ঈদের ছুটিকালীন ঢাকা শহরে বিট অনুযায়ী প্যাট্রোল ডিউটিও বাড়ানো হবে। যাতে শহরের প্রতিটি এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি ও টহল বৃদ্ধি পায়। ঈদের বাজার ও শপিংমলগুলোতে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিত করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে বলে জানান তিনি।
এফআর